অনলাইনে সারাদেশে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন মানিকগঞ্জের শিক্ষক এস এম রাব্বি

কড়চা ডেস্ক : ভার্চুয়াল জগতে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে সারাদেশে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন মানিকগঞ্জের শিক্ষক এস এম রাব্বি। করোনার শুরু থেকেই অনলাইনে পাঠদানসহ নানা ধরনের কর্মসূচির উদ্যোগ করে সারাদেশেই ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছেন এবং প্রশংসিত হয়েছেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

২০১০ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর থেকে তিনি মানবিকতা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম ও নিত্য নতুন উদ্ভাবনী সৃষ্টি দিয়ে তার স্কুল, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগ ছাড়িয়ে সারাদেশের শিক্ষকদের মানোন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলছেন।

চলতি বছরের ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসের প্রকোপ পড়লে দেশজুড়ে আতংক, উৎকন্ঠা এবং ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাখতে বিদ্যালয়গুলি ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। শিশুদের পাঠাদানের লক্ষ্যে সংসদ টিভিতে ক্লাস প্রচারের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেখানে শিক্ষক হিসেবে এসএম রাব্বিও বাছাই পর্বে ছিলেন। সংসদ টিভিতে সুযোগ না হওয়াতে তার সাথে আরও যারা বাছাইপর্বে ছিলেন সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ আলোকিত প্রাথমিক শিক্ষক পেইজে লাইভ ক্লাস করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মানিকগঞ্জ জেলা প্রসাশকের নির্দেশনায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিকল্পনায় ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের বাস্তবায়নে স্থানীয় ডিশ চ্যানেলে প্রচারের জন্য ভিডিও ক্লাস তৈরি করেন এই করোনা যোদ্ধা শিক্ষক এস.এম রাব্বি।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেও তার প্রতিভার আলোয় আলোকিত করে যাচ্ছেন সারাদেশের লুকায়িত প্রতিভাগুলিকে। করোনাকালীন সময়েও তার চারটি অনলাইন ভিত্তিক উদ্ভাবন সারাদেশে ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোড়িত হয়েছে। একটি হচ্ছে, ফেইসবুক লাইভ ক্লাস ফেস্টিভ্যাল। এই আইডিয়ার মধ্যেমে উৎসব উৎসব আমেজে শিক্ষকরা আনন্দের মধ্যে পাঠ নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও কাজে লাগছে এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হচ্ছে। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ধারণাটি বাংলাদেশ আলোকিত প্রাথমিক শিক্ষক পেইজ প্রথম ১৬ মে ২০২০ তারিখে ১৯ জন শিক্ষকের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। দেশের অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় রচিত হয় ভিন্ন মাত্রা। আরেকটি অন্যতম উদ্ভাবন হচ্ছে, স্টোরি ফর গুড। এই ইনোভেশনের মাধ্যমে সারাদেশের উপজেলা পর্যায়ে থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের বিভিন্ন কার্যক্রম, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতাকে তুলে ধরেন সারাদেশের শিক্ষকদের সামনে। সফল ও আলোকিত শিক্ষকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উদ্ভাবন হচ্ছে, প্রযুক্তি আড্ডা। এই ইনোভেশনের মাধ্যমে শিক্ষকদের আইসিটিতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। চতুর্থ উদ্ভাবন হচ্ছে-লিটল জিনিয়াস। এই ইনোভেশনের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত ও লুকায়িত প্রতিভাগুলিকে বিকশিত হতে উৎসাহিত করছে। সাথে সাথে অন্য শিশুদেরকেও উৎসাহিত করছে এবং শিশুদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করছেন।

এসব ছাড়াও তিনি আনন্দে ইংরেজি শিখি কার্যক্রমের জন্য সব সময় বিদ্যালয়ে ও অনলাইনে আনন্দায়ক ইংরেজী ক্লাস পরিচালনা করে থাকেন যা ইতিমধ্যে সারাদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এস এম রাব্বি মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন একজন শিক্ষক। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সবসময় সহযোগিতা করে থাকেন। ২০১৭ সালে মানিকগঞ্জ জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারন, শিক্ষা ও আইসিটি) মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নির্দেশনায় শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কল্যানে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপের অন্যতম এডমিন হিসেবে প্রতিনিয়ত সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করেন।

তিনি শিক্ষার্থীদের ইংরেজিভীতি দূর করতে বিভিন্ন ট্রেনিং এর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে পড়ার দক্ষতা উন্নয়নে Research Study-তে অংশগ্রহণ করেন।

এক পশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি ২০১৭ সালে ইংলিশ ইন অ্যাকশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত Teachers’ Voices Conference-এ অংশগ্রহণ করেন। তার Research Study টি Teachers’ Voices Conference জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিয়মিত অনলাইনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় ও বাস্তবায়নে জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘ঘরে বসে শিখি’র শুরু থেকে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়াও শিক্ষক বাতায়ন অনুমোদিত টিচার্স ড্রিম অনলাইনে এডুকেশন পেজে সারা দেশের শিক্ষকদের উদ্ভাবনী ধারণা যেমন I’m The Learner, অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে, আবৃতি প্রমিত উচ্চারন(ভাষার জন্য ভালোবাসা), নীতি গল্পের আসর, গল্পে গল্পে জীবন গড়ি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এ পর্যন্ত ৬০ টি লাইভ ক্লাস সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং শিক্ষক বাতায়নে অনলাইন রুটিনে তিনি এন্ট্রি করেছেন। এছাড়াও শিক্ষক বাতায়নের সদস্য বৃদ্ধিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অনলাইনে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

কোন প্রাপ্তির আশায় নয়, যা করছেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে করছেন বলে জানান এই প্রতিভাবান শিক্ষক। তিনি আজীবন নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার অধিকারী বলেন, করোনাকালীন সময়ের শুরু থেকেই এস এম রাব্বিসহ আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ডিজিটাল প্লাটফরম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। অনলাইনে শিশুদের পাঠদানসহ নানাধরনের কর্মসূচি সুনামের সাথে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। আমি নিজেও এসব ভার্চুয়াল কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছি। এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা সারাদেশের বিপুল সংখ্যক শিশুদের অংশগ্রহণ করাতে সক্ষম হয়েছেন।তাঁরা নিজেদেরে অর্থ এবং সময় খরচ করছেন হাসিমুখে। আশাকরি একদিন প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের এই কার্যক্রমের স্বীকৃতি পাবে। তাদের এই কর্মকান্ডে সারদেশে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

কড়চা/ জে আ বি

Facebook Comments
ভাগ