আজ স্নেহা’র জন্মদিন/ রুহুল ইসলাম টিপু

আমার তিন কন্যা সন্তান। শ্রেয়া, স্নেহা আর সৃষা। তিন রকমের মানুষ। আমার পৃথিবী। শ্রেয়া অটিজমে আক্রান্ত। আচরণগত সমস্যায় নিমজ্জিত। অথচ এক অফুরন্ত ভালোবাসার সাগর। সেথায় আমি সিক্ত। স্নেহা শান্ত ও নির্লিপ্ত। প্রগাঢ় দীপ্তময়। সৃষা দুরন্ত নদী। ছলাৎ ছলাৎ চলন বলন। লক্ষ্যে অবিচল। আমি তিন কন্যার বাবা। ওরা আমাকে বাবা হওয়ার গৌরব উপহার দিয়েছে। স্নেহার জন্মদিন আজ। তারিখ ২২ জুন। জন্মসাল ২০০৫।

স্মৃতিতে অজস্র কথা। শ্রেয়াকে নিয়ে উৎকন্ঠা, চিকিৎসা ও ছুটাছুটির দিক দিগন্ত নেই। অটিজম অভিজ্ঞতায় আমরা খুবই ক্লান্ত এবং অবসন্ন ছিলাম। শ্রেয়ার এক বা একাধিক ভাই-বোনের বড় প্রয়োজন। এ উপলব্ধি ওদের মায়ের। আমরা স্বামী-স্ত্রী পৃথিবী ত্যাগ করা মাত্র শ্রেয়াকে দেখার আর কেউ থাকবে না। আমার স্ত্রীকে এ বেদনা বেশ যন্ত্রণাকাতর করে তুলে। শ্রেয়ার জন্মের পূর্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টি এ চৌধুরী এবং স্নেহার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফারুক পাঠান এর চিকিৎসা সহায়তা আমরা গ্রহণ করি। আমাদের দ্বিতীয় সন্তান কখন আসবে এবং কিভাবে আসবে। এটি নিয়ে আমরা বেশ দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করি। চিকিৎসা গ্রহণের এ প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল স্ত্রীকে ওজন কমাতে হবে। তিনি খুব অল্প সময়েই কাঙ্খিত কম ওজন নিজেকে উপহার দিয়ে চিকিৎসকের সাধুবাদ গ্রহণ করেন। একইসাথে আমরা দ্বিতীয় সন্তানের অস্তিত্ব উপলব্ধি করি। থাকি মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় মাটির মসজিদের নিকট। বাসা একটি হাসপাতালের পঞ্চম তলায়। মুক্তি ক্লিনিক। বাড়ির মালিক স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। মনোরম একটি হাসপাতাল বানিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। অথচ এ হাসপাতালের বাইরের চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আমরা মনঃস্থির করি। কারণ শ্রেয়া অটিস্টিক। আমাদের ভয় দ্বিতীয় সন্তান স্বাভাবিক ও সুস্থ হবে তো। তাই আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বড় হাসপাতাল এ দুটোকে নির্বাচন করি। চলে যাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বর্তমান মানিকগঞ্জ সমিতি’র সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ রওশন আরা বেগম এর নিকট। নেপথ্যের ইচ্ছে রওশন আপার চিকিৎসার সাথে আমরা হলি ফ্যামিলিতে সন্তান জন্মদানের সুযোগ গ্রহণ করবো।

লিখতে বসলে যেভাবে চাই, সেভাবে হয় না। বাঁক পরিবর্তন হয়ে পথ যায় অন্য গন্তব্যে। জীবনও সেরমক। এখন স্নেহা ‘ও’ পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক আট দিন পর ০১ জুলাই থেকে স্নেহা পরিত্যাগ করবে স্কুলের গন্ডি। প্রবেশ করবে কলেজের পথে একাদশের শিক্ষার্থী হয়ে। স্নেহা ঘুমাচ্ছে। আমার ভাবনায় স্নেহার পৃথিবী দর্শনের পূর্ব পরিস্থিতি। সময় বেশ ঘনিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে যেতে হচ্ছে ডাঃ রওশন আপার চেম্বারে। যাতায়াতের বাহন ভেসপা। আমার সামনে বসে শ্রেয়া। পিছনে শ্রেয়ার মা ও তার দেহের ভিতর অনাগত সন্তান। আপা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানের বিষয় বিবেচনা করে আমাদের প্রচলিত লাইনের বাইরে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। এতে সময়ের কালক্ষেপণ ঘটে না। এ সময় পর্যন্ত আমি মানিকগঞ্জ সমিতি’র নির্বাহী পরিষদের বলয়ের বাইরেই ছিলাম। পরবর্তীতে দু’বার নির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হয়েছিলাম।

সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক হাসানুল হক ইনু’র নিকট হতে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার গ্রহণ করছে স্নেহা। স্থান: বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ।

স্নেহার জন্মের এক সপ্তাহ পূর্বে। দিনটি ছিল মেঘলা। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে সিদ্ধেশ্বরী আপার চেম্বারে হাজির। এরপর অঝোড়ে বৃষ্টি। আপা আভাস দিচ্ছেন, প্রস্তুতি গ্রহণ করতে; এ সপ্তাহেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। বৃষ্টির জন্য বেশ অপেক্ষার পর চেম্বার থেকে বের হই। খুব সাবধানে ভেসপা নিয়ে মৌচাক মার্কেট পার হলাম। মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত পানি। অথই পানি। বৃষ্টির ফোটা তখন বেশ ছোট ছোট। তবে এ পানি অতিক্রম করে যাওয়া বেশ বিপজ্জনক। রিক্সাও পেলাম না। ওদের রিক্সায় তুলে দিয়ে আমি ভেসপা নিয়ে যাবো। সেটিও হলো না। শ্রেয়াকে ভেসপায় বসিয়ে পানির মধ্যে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। একটু যেতেই ভেসপা পড়ে যায় একটি অজানা গর্তে। আমি হাবুডুবু। শ্রেয়া নাকানি চুবানি। কী ধরবো। কি রক্ষা করবো। কিছুই বুঝতে পারিনি সে সময়টা। একজন যুবক এসে শ্রেয়াকে নিলেন কোলে তুলে। আমার স্ত্রীকে বললেন, ধরুন আমার হাত। আসুন আমার সাথে। শ্রেয়া এবং তার মাকে নিয়ে এলেন মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত। ভেসপা এবং ডুবো পানিতে ভাসতে ভাসতে আমার উদ্ধার ঘটল বেশ সময় পরে। সেই যুবক যিনি ছিলেন আমাদের উদ্ধার কর্তা। তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। ঘটনাটির সাথে একটি অজানা আতঙ্ক আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমরা প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম স্নেহাকে। পৃথিবীতে আসার পূর্বেই। আমার স্ত্রীর কান্না এবং আর্তনাদের স্নেহা পৃথিবীতে এলো এক সপ্তাহ পর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। আমাদের আনন্দ এবং উৎসবের দিবস। স্নেহার জন্ম।

আজ স্নেহার ১৬ বছর পূর্ণ হলো। সকল সন্তানের নিকট হতে পেয়েছি বিচিত্র শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা। বাবা মানে একটি দায়িত্ব। এ জায়গায় নিজেকে আমি মানসম্মত ও মানানসই করতে পারিনি। তবে আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার কমতি রাখিনি। এটুকু বলতে পারি। অজস্র সীমাবদ্ধতা আমার। স্নেহার ভিতর এ বোধ এবং উপলব্ধির প্রকাশ খুবই ছোট বেলা হতে দেখতে পাই। স্নেহা ইতোমধ্যে বেশ দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে। আমাকে গর্বিত হওয়ার অহংকারটুকুর দান স্নেহার। স্নেহার স্কুল জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে প্রথম দিনের বিদ্যালয়ের কথা মনে পড়ে। সে সময় তার মা তৃতীয় সন্তান পেটে ধরেন। স্নেহার স্কুল শুরু পাশের বাসার খালাম্মা ও বন্ধুদের সাথে; মায়ের হাত ধরে নয়। আমি ছিলাম সকালের সাথী। সুইট বার্ড স্কুল, আদাবর, মুনসুরাবাদ এলাকায়। দেড় বছর পর চলে আসে প্রাইম ব্যাংক গ্রামার স্কুল উত্তরায়।

বাংলা অলিম্পিয়াড এর পুরস্কার গ্রহণের প্রাক্কালে কবি ফরিদ কবির, মোহাম্মদ এ আরাফাত ও যাদু শিল্পী জুয়েল আইচ এবং অন্যান্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের সাথে স্নেহাকে দেখা যাচ্ছে।

ছবি আঁকা এবং গান। উভয়ের প্রতি আগ্রহ স্নেহার। প্রতিযোগিতায় পুরস্কার গ্রহণও নেহাত কম নয়। বিশেষভাবে স্মরণ করতে পারি দেশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসমূহ নিয়ে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোপ স্কুল বাংলা অলিম্পিয়াড এর ব্যানারে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হয় প্রতি বছর। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় গানে তৃতীয় স্থান অধিকার করে স্নেহা। দেশের বরেণ্য ব্যক্তি এবং একাধিক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল সে অনুষ্ঠান। স্নেহার স্বপ্নগুলো কখনও আমি ধরতে পারি। কখনও বা সেসব বেশ ধুয়াশা। তবে তার পরিধি এবং ব্যাপকতা কিছুটা অনুমেয়। কিছুটা প্রকাশ ঘটে যখন দেখি কড়চা’য় তার লেখা মহাকাশ যাত্রায়। আমি পুলক অনুভব করি। পঞ্চম শ্রেণির শেষ দিকে আমাকে জানায় একটি উপন্যাস লিখছে। প্লটটা কিছুটা বলেছিল। এটির অঙ্কুরেই মৃত্যু হওয়া অসম্ভব নয়। তবে ভাবনার জন্য সাধুবাদ জানাতে পারি। সুযোগকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাই পারে সৃষ্টি তৈরি করতে। এ দক্ষতা স্নেহার মধ্যে বেশি বিরাজমান, এটি আমার বিশ্বাস।

বড় বোন এবং ছোট বোন। উভয়ের দায়িত্ব স্নেহার। শৈশব কৈশোরের আনন্দ উচ্ছ্বাস পরিপূর্ণ উপভোগ করে জীবনের উপলব্ধির বিকাশ ঘটুক। এ বছরের জন্মদিনের সাথে স্নেহার একটি মাইলফলক অতিক্রমের অভিনন্দন জানাতে চাই। সফলতার সাথে স্কুল জীবনের পরিসমাপ্তি। একই অঙ্গীকার দেহ ও মননে বাস করা আবশ্যক সাফল্যের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখার। সেটি উচ্চতর শিক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত।

আমরা তো শিক্ষা গ্রহণ করি দেশের জন্য, মানুষের জন্য। আমাদের শিক্ষা এবং অবদান দেশ মা’কে সমৃদ্ধ করা। বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে আসে স্নেহার ১৬ বছর। দেশ পরিকল্পনার সাথে ব্যক্তি পরিকল্পনার সমন্বয়ের প্রয়োজন। এতে দেশের কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়া এবং মিলে ধরার সুযোগ ঘটে। জন্মদিন উদযাপন পরিপূর্ণ হোক দেশ, পৃথিবী এবং প্রকৃতির সাথে একাত্মময় শান্তি বিকাশের মাধ্যমে। সার্থক হোক আমার স্নেহার জন্ম।

কড়চা/ আর আই টি

Facebook Comments Box
ভাগ