করোনার দাওয়াই যখন মিউজিক থেরাপি

কড়চা ডেস্কঃ কেমব্রিজের অ্যাঞ্জিলা রাসকিন ইউনিভার্সিটির মিউজিক, হেলথ অ্যান্ড ব্রেনের গবেষক জর্জ ফ্যাকনার ও তাঁর সহযোগীরা হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের নানা সুর শুনিয়ে তাঁদের মস্তিষ্কের ইলেকট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম বা ইইজি রিপোর্টে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখেছেন। এই গবেষণাপত্রে জানা গেছে যে, মস্তিষ্কের এক বিশেষ নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ায় রোগীদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট অনেকটাই কমে। মিউজিক থেরাপি গবেষণায় এটি এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে দাবি প্রোফেসর ফ্যাকনারের। মিউজিক থেরাপির বিশেষজ্ঞদের মতে সুরের জাদুতে বিভিন্ন অসুখ-বিসুখের বাড়বাড়ন্তকে আটকে দেওয়া যায়।

ভারতবর্ষ, মিশর, চিন, গ্রিস আর রোমে সভ্যতার শুরুতে সুরের সাহায্যে অসুখ সারানো হত। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বহু দিন তা ধামাচাপা পড়ে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে চিকিৎসকেরা আহত সৈন্যদের ব্যথা-যন্ত্রণা কমাতে মৃদু লয়ের গান-বাজনা ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য ফল পান। গান বাজনা দিয়ে চিকিৎসার সূত্রপাত তখন থেকেই। সৈন্যদের কষ্ট লাঘব হওয়ার সময় থেকেই একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী সমীক্ষা শুরু করে তা লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন। দেখা যায়, শরীর ও মন-দুইয়ের কষ্ট কমাতেই সুরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে।

বস্টনের বার্কলে কলেজ অফ মিউজিকের অধ্যাপক সুজান হ্যানসার সুর-চিকিৎসার সাহায্যে শরীর ও মনের বেশ কিছু সমস্যা নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়েছেন। নির্দিষ্ট কিছু সুর শোনালে রোগীর উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ কমে মন শান্ত হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমশ স্বাভাবিক হতে শুরু করে, রক্তচাপ কমে, হৃদপিণ্ডের অতিরিক্ত স্পন্দন কমতে শুরু করে, পেশির কাঠিন্য ও ব্যথার উপশম হয়, মন-মেজাজের তিরিক্ষি ভাব চলে গিয়ে মন শান্ত হয়, মাথার যন্ত্রণা, বুকে অস্বস্তি কমে, ডোপামিন নিঃসরণ হয় বলে ভাল ঘুম হয়, শারীরিক অস্বস্তি ও কষ্টের বোধ কমে যায়, হজমের অসুবিধা ও পেটের সমস্যা চলে যায়, রাগ চলে গিয়ে মন ভাল থাকে Ges ডিপ্রেশন ও অকারণ মন খারাপের হাত থেকে রেহাই মেলে।

তবে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, মিউজিক থেরাপি কিন্তু কোনও ম্যাজিক ওষুধ নয়, ধীরে ধীরে কাজ করে। সুর চিকিৎসা খুব ভাল কাজ করে বাচ্চা ও বয়স্কদের উপরে। গান মনঃসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। সমীক্ষায় প্রমাণিত, ছোট্ট বয়স থেকে যারা গান-বাজনা শোনে তাদের একাগ্রতা তুলনামূলক ভাবে বেশি। এমনকি যে সব বাচ্চা জন্মের সময় থেকেই গান শোনে, তারা অন্যদের থেকে অনেক আগে কথা বলতে শেখে। মস্তিষ্কের কথা বলার অংশকে উজ্জীবিত করে সুর। গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোক আক্রান্ত বয়স্ক মানুষদের কথা বলার ক্ষমতা চলে গেলে (অ্যাফাসিয়া) ভাল গান শোনালে তাঁরা সহজে কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পান।

শরীর মন— দুই-ই ভাল রাখতে সাহায্য করে সুন্দর সুর, জানিয়েছেন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি অব মন্ট্রিল–এর মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল জে লেভিটিন, নিউরোসায়েন্স অব মিউজিক-এর উপর ৪০০টি স্টাডি করে তিনি এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
গুরুতর অসুস্থ কিছু রোগীকে নিয়ম করে গান-বাজনা শুনিয়ে দেখা গেছে যে, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ইমিউনোগ্লোবিউলিনের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এই ন্যাচারাল কিলার সেল আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার জীবাণুদের বিরুদ্ধেও লড়াই করার জন্য প্রস্তুত থাকে আমাদের শরীর। এছাড়া স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে মনের চাপ কমায়। সুতরাং, করোনাকে জব্দ করতে সঙ্গী করুন সুরকে। কোভিড-১৯ সংক্রমণে যাঁদের সপ্তাহ দুয়েক হাসপাতালে বা আইসোলেশনে থাকতে হয় তাঁদের জন্য এটি কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Facebook Comments
ভাগ