করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কেন ক্লান্ত লাগে? ডা. অপূর্ব চৌধুরী

গত ছয় মাসে কোভিড-১৯ এর লক্ষণ গুলো কি কি, সবার কমবেশি জানা হয়ে গেছে। একটু জ্বর, সর্দি, গলা ব্যথা, খানিক গা ব্যথা ব্যথা, নাকে গন্ধ না পাওয়া, খেতে না ইচ্ছা করা, খাবারের স্বাদ না পাওয়া, পেট একটু উলটপালট, দিন গেলে কাশি, অযথা দুর্বল লাগা, এই ভালো এই ক্লান্তি, শরীর খারাপের দিকে গেলে খানিক শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া। হসপিটালে যাওয়ার পরিস্থিতি না হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সমস্যাগুলোই ভোগায়।

এতগুলো সমস্যা কয়েকদিনের মধ্যেই আসে আর যায়। হাসপাতালে যাওয়ার দরকার না হলে শরীর আস্তে আস্তে সমস্যাগুলো থেকে বের হয়। কিন্তু একটা সমস্যা আক্রান্তকালীন এবং আক্রান্ত পরবর্তী অনেকদিন ধরে থেকে যায় । এটি হলো, ইংরেজিতে Fatigue. বাংলায় ক্লান্তি বা অবসাদ। এই সমস্যাটি কেন হয়, কিভাবে হয় এবং সমস্যাটি থেকে বের হওয়ার কোন উপায় জানা আছে কিনা, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

ক্লান্তি কি? যেকোনো ভাইরাস শরীরকে আক্রান্ত করার পরে আক্রান্তকালীন অকাণে দুর্বল লাগে। এই অকারণে দুর্বল লাগাই ক্লান্তি। এটি স্বাভাবিক। আবার সুস্থ হয়ে ওঠার পরে বা ভাইরাসটি শরীর থেকে যাওয়ার পরেও দেখা যায় যে, অনেকদিন ধরে এই ক্লান্তি বা দুর্বল লাগা থেকে যায়। এমন অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে Post viral fatigue বা সংক্ষেপে PVF. কেউ কেউ বলে Post viral fatigue syndrome বা PVFS. আলোচনার সুবিধার্থে সংক্ষেপে PVF ব্যবহার করব।

কোভিড আক্রান্তদের সুস্থ হওয়ার পরবর্তী এমন অবসাদগ্রস্থ কিংবা অধিক দুর্বল লাগা যেমন দীর্ঘদিন থাকতে পারে, তেমনি এই পথে এই দুর্বল লাগাটি শরীরের অনেক নতুন সমস্যাকেও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

কেন হয় ? ভাইরাস কিংবা করোনাভাইরাস যেটাই হোক, এমন দীর্ঘকালীন PVF থাকার কারণ কি তা চিকিৎসকরা এখনো বের করতে পারেননি। তবে ধারণা করা হয় যে, যখন আক্রান্ত হয় তখন শরীরে Cytokines নামের রাসায়নিক পদার্থটি এই ক্লান্ত হওয়ার পিছনে দায়ী। ভাইরাসের ক্রিয়ায় শরীর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই cytokines কেমিক্যালটি বের করে । পরিস্থিতি যত বেশি মারাত্মক হয়, রক্তে cytokines বেশি পরিমাণ বের হতে থাকে। যত বেশি পরিমাণ Cytokines থাকে, ততবেশি দিন লাগে সেটার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকে বের হতে।

সাথে আরেকটি মজার জিনিস ঘটে। শরীর ভাইরাসের উপস্থিতি মনে করে যখন Cytokine অনেক বেশি বের করে, ভাইরাস চলে যাওয়ার পরেও Cytokine এর সেই কিছু পরিমাণ তারপরেও বের হতে থাকে। বের না হওয়ার আগের পরিস্থিতিতে যেতে শরীরের তাই সময় লাগে। এবং এই সময়কাল কারো ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ, কারো ক্ষেত্রে চার সপ্তাহ লাগে।

ভাইরাস ছাড়াও অন্য অনেক কারণে শরীরে দীর্ঘকালীন এই ক্লান্তি বা অবসাদ লাগে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় পুরো ব্যাপারটিকে Chronic fatigue syndrome বা CFS bole. আরেকটু নির্দিষ্টভাবে বলে Myalgic encephalomyelitis.

কতদিন থাকে? Covid-19 আক্রান্ত হলে ক্লান্তি বা অবসাদ যেমন একটি কমন লক্ষণ, তেমনি যেকোনো ফ্লু হলেও এটি হয়। আক্রান্তকালীন যেমন অবসাদগ্রস্থ লাগে, তেমনি সেরে ওঠার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত ফ্লু জাতীয় কিছুতেও এমন ক্লান্তি লাগে। এমনিতে শরীরে কোন সমস্যা হলে সেই সমস্যা পরবর্তী সময়ে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত শরীর ক্লান্ত লাগতে পারে। যেমন ক্যান্সার আক্রান্ত কেউ কেমোথেরাপি নিলে, ক্রনিক আর্থ্রাইটিস জাতীয় রোগে ভুগলে। epstein barr virus নামের এক প্রকার ভাইরাস গ্লান্ডুলার ফিভার নামে একটি রোগের জন্ম দেয়। এই রোগ পরবর্তী সেরে ওঠার পর দীর্ঘদিন অবসাদগ্রস্ত লাগে।

যেকোনো ফ্লু হলে যদিও এই অবসাদগ্রস্ত সময়কাল এক থেকে দুই সপ্তাহ, কিন্তু করোনাভাইরাস এর ক্ষেত্রে এটি ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত যেতে পারে । করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার কয়েকদিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে PVF চলে যায়। কিন্তু দেখা গেছে যে 10% করোনা রোগীদের, এমনকি যারা মাইল্ড সিমটমে আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের এই Fatigue বা PVF চলে যেতে চার থেকে আট, এমনকি ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রায় তিন মাস। হসপিটালে যাওয়ার মত অবস্থা হলে তাদের ক্ষেত্রে এমন PVF কাটিয়ে উঠতে ৬ মাসও লেগে যেতে পারে। কোভিড আক্রান্তের পরে যদি ছয় সপ্তাহের পরেও এই অবসাদগ্রস্ত ভাব থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

কি করে বুঝবে ক্লান্তি বা অবসাদে আক্রান্ত?

* কোন কারণ ছাড়াই শক্তিহীন বা দুর্বল লাগা
* অনেক বেশি ঘুম পাওয়া
* কোন কাজ বা হাঁটতে কিংবা উঠতে-বসতেও শরীরের স্বাভাবিক ব্যালেন্স হারানো
* কোথাও বেশিক্ষণ বসে থাকলে অস্বস্তি লাগা
* সহজে দৈনন্দিন জিনিসগুলো ভুলে যাওয়া
* সহজে কোন কিছুতে বিরক্তিকর হয়ে ওঠা।

কোভিডকালীন অথবা কোভিড পরবর্তী সময়ে এই অবসাদগ্রস্থতা বা ক্লান্তি লাগা উঠানামা করে। দিনের কোন মুহূর্তে খুব এনার্জিটিক অনুভব করবেন। আবার হয়তো হঠাৎ করে দেখবেন খুব দুর্বল লাগছে। আবার কোনদিন পুরো দিনটাই হয়তো দেখবেন ভালো। পরদিন আবার ঘুম থেকে উঠে দেখতে পারেন দুর্বল লাগছে। দিনের শুরুতে স্বাভাবিক মানুষের মতোই মনে হবে নিজেকে। দিনের শেষ দিকে হঠাৎ করে কোন কারণ ছাড়াই অবসাদগ্রস্ত মনে হবে। প্রত্যেকটা ব্যাপারকে স্বাভাবিক ধরে নেবেন। উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই।

কি করে ক্লান্তি বা অবসাদগ্রস্ততা থেকে বের হবেন?

* নিজেকে পরিবারের অন্য সবার থেকে আলাদা কোন রুমে আলাদা করে ফেলুন।
* পর্যাপ্ত রেস্ট নিন। শারীরিক এবং মানসিক দুই দিক থেকেই রেস্ট দিন।
* পর্যাপ্ত ঘুমান। নরমালের চেয়ে বেশি ঘুমান।
* ক্ষুধা থাকলে নর্মাল খাবার খান। ক্ষুধার ভাব কমে গেলে অল্প অল্প করে অনেকবার ভাললাগার খাবারগুলো খান।
* শরীরকে সচল রাখুন । ঘরে সকাল-সন্ধ্যা হাটুন। ধীর পায়ে হাঁটুন। একটু হেঁটে অধিক বিশ্রাম নিয়ে আবার নিজেকে নড়াচড়া করুন।
* মস্তিষ্ককে বিনিয়োগ করতে হয় এমন কাজে সময় দেবার দরকার নেই। যেমন: সোশ্যাল মিডিয়া । যেমন: উদ্বিগ্ন যুক্ত কোন খবর পড়া। যেমন: কোনো কঠিন বিষয় কোন বই পড়া। এমনকি এই মুহূর্তে লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে অযথা নিজেকে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত না করতে পারলে ভালো। উদ্বিগ্নতা অবসাদকে আরো বেশি টেনে নিয়ে যায় ।
* মনকে উৎফুল্ল রাখুন। প্রাণ খুলে হাসতে পান এমন কিছু দেখুন, পড়ুন অথবা মজা করুন। মন আপনাতেই প্রজাপতির মতো নাচবে, শরীর আপনাতেই ঝরঝরে উঠতে চেষ্টা করবে ।
* অবস্থা ভালোর দিকে গেলে কাজের পরিমাণ বাড়ান, হাঁটার পরিমাণ বাড়ান, খাবারের পরিমাণ বাড়ান, মস্তিষ্ককে আরেকটু বিনিয়োগ করুন।
* দিনের বিভিন্ন সময়ে নিজেকে রিলাক্স করবার স্পেস খুঁজে নিন।
* ঘুম-খাওয়া-কাজ এগুলোকে একটি রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসুন।

দুর্বল বা ক্লান্ত লাগলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভয় বা উদ্বিগ্ন হলে ক্লান্তি আরো বেড়ে যাবে, তেমনি ক্লান্ত অবস্থা থেকে বের হতেও সময় লাগবে। সুতরাং ভারমুক্ত থাকুন যে, সময়ে এটি কেটে যাবে।

সূত্র-
1. BMJ: British Medical Journal
2. The Lancet
3. RCOT: Royal College of Occupational Therapists
4. OUH: Oxford University Hospital NHS Foundation Trust
5. ME Association

অপূর্ব চৌধুরীঃ চিকিৎসক এবং লেখক জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য বই: অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত

 

Facebook Comments
ভাগ