ক্রিকেটার দুর্জয় : মাঠ থেকে জাতীয় সংসদে

দীপক কুমার ঘোষ

এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়, আদ্যপান্ত একজন ক্রিকেটার। প্রয়াত বাবা এ এম সায়েদুর রহমান জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারী, বড় মামা গোলাম ছারোয়ার টিপু জাতীয় ফুটবলার এবং পরে জাতীয় ফুটবল দলের কোচ। বাবা ক্রীড়া সংগঠক, মামা নামজাদা খোলোয়াড়। সেই পরিবারে দুর্জয়ের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।

মানিকগঞ্জ শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে ছোটবেলার ছোটখাটো ছেলেটা কিছুটা ডানপিটে হলেও দুর্জয়ের বাসা থেকে যখন ক্রিকেট সামগ্রী নিয়ে নিয়মিত মাঠে আসতাম তখন আমার আর সাঈদের পেছন ছাড়তোনা ছেলেটি। মাঠে জোর করেই চলে আসতো। আমরা অনুশীলন করতাম। দুর্জয় বল কুড়িয়ে আনতো। একদিন অনুশীলন এর সময় আমি ও সাঈদ দুর্জয়ের হাতে ক্রিকেট বল তুলে দিলাম এবং বললাম বল করতে। সেই থেকে দুর্জয়ের ক্রিকেটে হাতেখড়ি। সেইতো শুরু। প্রতিভা আর আগ্রহ এবং পরিবার যার সহায়ক তারতো আর পিছন ফিরে তাকানোর কথা নয়। হলোও তাই।

বিকেএসপি-তে ভর্তী। সেখানেই ক্রিকেট এর বেসিক শেখা। তারপর বিকেএসপি শেষ করে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়। ততদিনে ডানহাতি অফস্পিনার এবং মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে ধূমকেতুর মত নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে ক্রীড়াঙ্গনের সর্বত্র। তারপর অভিজাত ক্লাব আবাহনীর খেলোয়াড়, অধিনায়ক। সদ্য প্রয়াত বামহাতি স্পীনার রামচাঁদ গোয়ালার পরে ডানহাতি অফস্পিনার হিসেবে দুর্জয় অপরিহার্য স্থান করে নেয় জাতীয় ক্রিকেট দলে অল রাউন্ডার ক্রিকেটার হিসেবে। যোগ্যতা আর কর্মক্ষমতা দিয়ে জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন এর দায়িত্ব পান। এর আগে জাতীয় যুব ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করে ছিনিয়ে আনে বিশ্ব যুবকাপ শিরোপা। সেখানেও ফাইনালে সে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। ঝড়ের গতিতে দ্যুতি ছড়িয়ে ক্রিকেটাঙ্গনে উজ্জ্বল তারকা খ্যাতিলাভ করে দুর্জয়। তারপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষন ২০০০ সনের ১০ জুন, ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকিতদিন।

এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। গ্যালারী উপচেপড়া ক্রিকেটপাগল দর্শক। প্রিন্স অব ক্যালকাটা সৌরভ গাঙ্গুলী আর ক্রিকেট বিস্ময় টাইগার দুর্জয় টস করতে মাঠে নামেন। বিপুল করতালিতে মুখরিত স্টেডিয়াম। খেলা শুরু দুর্জয়ের রেকর্ড সৃস্টি করা বোলিং। অফস্পিনের ঘুর্নিযাদুর ১৩০ রানের বিনিময়ে ৬ উইকেট লাভ। সেই দুর্দান্ত মায়াবী ঘুর্নিযাদুর ফাঁদে পড়ে ক্রিকেট ঈশ্বর বলে খ্যাত শচিন টেন্ডুলকারও আউট হন।

দুর্জয়ের দুর্দান্ত all round performance যখন ক্রিকেটে আলো ছড়াচ্ছে তখন কোকো ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের প্রধান। দুর্জয় আওয়ামী ঘরনার। তার বাবা বঙ্গবন্ধুর নৌকা মার্কার এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী, মা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাই তাকে জাতীয় দল থেকে বাদ দিতে হবে। হলোও তাই। প্রতিভার উন্মেষ ঘটতে দিলোনা। দুর্জয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলী হলো।

সে দুর্দিনে তার পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। প্রথম আলো পত্রিকায় এক সক্ষাৎকারে দুর্জয় বললো, “আমার পিতার নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে যাবো, পিতার দেখানো আদর্শের রাজনীতি করবো। জনগণ এর বিচার করবে”।

আমি এবং সাঈদ খান মজলীশ দুর্জয়ের ক্রিকেট কোচ এবং অভিভাবক হিসেবে রাজনীতিতে আগমনকে স্বাগতম জানালাম। ব্যানার লাগালাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা, আওয়ামী লীগের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা সবকিছু জানতেন। নজর রাখতেন। তারই ফলশ্রুতিতে দুর্জয়কে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন দুর্জয়ের প্রয়াত পিতার আসনে। ২০১৪ এর সেই তালমাতাল পরিস্থিতিতে দুর্জয়কে নির্বাচন করতে হয়। সেখানে আমরা সকল ক্রীড়ানুরাগীরা দুর্জয়ের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে কাজ করি এবং দুর্জয় বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ঘিওর-শিবালয়-দৌলতপুর আসনে।

২০০১৮ তেও দুর্জয়কে ধানের শীষের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে জয়লাভ করতে হয়। তখনো ক্রীড়াঙ্গনের সকলেই দুর্জয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ছিলাম। দুর্জয়ের সাথে খেলেছি, দুর্জয় আমার অধিনায়কত্বে খেলেছে। আমি দুর্জয়ের অধিনায়কত্বে খেলেছি। দেখেছি তার ক্রিকেট নান্দনিকতা, মেজাজ এবং ক্রিকেটেও আগ্রাসী চরিত্র। এককথায় চমৎকার।

আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি, “আমাদের ছাত্র, আমাদের খেলোয়াড় আজ সংসদ সদস্য”।

জীবনের প্রতিটি বাঁকেই দুর্জয়কে challenge face করেই এগুতে হচ্ছে,আগামীতেও সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই দুর্জয় এগিয়ে যাবে সে প্রত্যাশা আমরা করি। কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনা পাশে আছেন। আছেন এলাকার জনগণ। আছে প্রয়াত বাবার দোয়া।

এ লেখাটি দুর্জয়ের বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হওয়ার ঐতিহাসিক উজ্জ্বল দিনটিকে স্মরণ করে।

★জয় বাংলা★জয় বঙ্গবন্ধু।।

Facebook Comments Box
ভাগ