ক্রিকেট গুরু সাঈদ খানমজলিশের জন্মদিনে শুভ কামনা

ছবিঃ সংগৃহীত

সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু

শুক্রবার নিরবেই পার হয়ে গেছে মানিকগঞ্জের শত শত কিশোর-তরুণের “ক্রিকেটগুরু” সাঈদ খানমজলিসের জন্মদিন। বিকেএসপি’র দেশব্যাপি ট্যালেন্টহান্ট কর্মসূচীর একজন হিসেবে এই সাঈদ ভাই হান্ট করেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউণ্ডার সাকিব আল হাসানকে। সাকিব, মুশফিকের মত খ্যাতিমান অনেক তারকা ক্রিকেটারের সূচনালগ্নের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

মানিকগঞ্জ শহরের একই পাড়ায় জন্ম আমাদের। সাঈদ ভাই বয়সেও কয়েক বছরের বড়। আমাদের বাড়ির পাশেই কলেজ মাঠ। স্কুল বয়সে এই কলেজ মাঠেই তাঁকে দেখেছি ক্রিকেটের ব্যাট-বল নিয়ে মেতে থাকতে। মাঠে প্রতিদিনই কোননা কোন ক্রিকেটম্যাচ থাকতোই। যে দিন না থাকতো সেদিনও ব্যাটবল নিয়ে মাঠে নামতাম পাড়ার ছোটবড় সবাই মিলে। সাঈদ ভাই যে টিমেই খেলেছেন সারাজীবন তার পজিশন ছিল নির্ধারিত। প্রতিটি ম্যাচে সাঁই সাঁই করে ছুঁটে আসা চকচকে প্রথম বলটি ফেস করতেন তিনি। মুগ্ধ হয়ে তাঁর ব্যাটিং দেখতাম।

সাঈদ খানমজলিশ

একসময় আমাকেও ক্রিকেট নেশায় ধরেছিল। আমিও খেলতাম,আমাকে ধরে বেঁধে নামানো হত ওপেনিংএ। বলে দেয়া হত,”তোমার কাছে রান চাই না,ওদের ওপেনিং বোলারদের ওভারগুলো খেয়ে দিয়ে আসো।” আমিও সারাজীবন তাই করবার চেষ্টা করতাম যাতে আমার টিমের মারকুটে ব্যাটসম্যানরা পেসারদের মুখে না পড়েন, নতুন বলের বাড়তি সুইংয়ের ফাঁদে পরে নাকাল না হন। সেই আমিও সাঈদ ভাইয়ের সাথে একই টিমে বেশ কবার খেলেছি। একসাথে জেলা দলে খেলেছি, কলেজ টিমে খেলেছি। লীগ, টুর্ণামেন্টে তাঁর প্রতিপক্ষ দলেই খেলেছি বেশী। একই টিমে আমরা দুজন ওপেনিংয়ে যতবার নেমেছি ততবারই আমি আউট হয়েছি সাঈদ ভাইয়ের পরে। বিষয়টা আমার কাছে আজও রহস্যময় মনে হয়। কারণ আমার কোন মাপ না থাকলেও সাঈদ ভাই উঁচুমাপের ওপেনার ছিলেন।

সাঈদ ভাই তার ক্রিকেটমেধা, নিষ্ঠার জোরে ক্রিকেট কোচ হিসেবে বিকেএসপি, বিসিবির তালিকাভূক্ত কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পাশাপাশি মানিকগঞ্জে গড়ে তুলেছেন “ক্রিকেট কোচিং সেন্টার”। এই সেন্টার থেকে গত দেড় যুগে অসংখ্য ক্রিকেটারের ক্রিকেটে হাতেখরি হয়েছে। তাদের অনেকেই জেলা লীগ,ঢাকার প্রিমিয়ার লীগের নামকরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন। এই শত ক্রিকেটারদের কাছে সাঈদ খানমজলিশ “ক্রিকেটগুরু”।

আমার ক্রিকেট নেশার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল খেলোয়াড় থেকে টুপ করে বিদায় নিয়ে জেলা ক্রিকেট লীগে আম্পায়ারিংয়ের মাধ্যমে। সে সময় মানিকগঞ্জ জেলায় কোন পাশ করা বা, কোর্স করা কোন আম্পায়ার ছিলেন না। আমাদের মত অবসরে যাওয়া, খেলা ছেড়ে দেয়া মানুষেরাই এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। ভাববেন না আম্পায়ারিং কোর্স করিনি বলে আমাদেরকালে আমরা যেনোতেনো খেলোয়াড়দের পার করেছি। সেটা ভাবলে ভুল হবে। আবাহনী,মোহামেডান,ইয়াংপ্যাগাসাসের মত দলের তারকা ক্রিকেটাররা তখন মানিকগঞ্জের লীগ, টুর্ণামেন্টে নিয়মিত “খ্যাপ” খেলতে আসতেন। এদের অধিকাংশই তখন আমাদের জাতীয় ক্রিকেট টিমের সদস্য, নয়তো আবাহনী, মোহামেডানের তারকা খেলোয়াড়।

টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের সাথে

একবার দাশড়া পল্লীমঙ্গল একাদশে খেলতে এসেছিলেন শ্রীলংকান ন্যাশনাল টিমের ইউকেটরক্ষক কাম ওপেনার ব্র্যাণ্ডন কুরুপ্পু। কুরুপ্পু গামাগি, আহাঙ্গামাসহ মোট ৫জন। এরা পরে শ্রীলঙ্কার হয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মাতিয়েছেন। তাদের মত খেলোয়াড়দের ম্যাচে আম্পায়ারিং করেছি সামান্য বিতর্ক ছাড়া। মাঠ ছেড়েছি মাথা উঁচু করেই। এরাঁ কোনদিন বুঝতেই পারেন নি আমরা শখের আম্পায়ার।

একসাথে খেলে, খেলা ছেড়ে আমি যখন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শখের আম্পায়ারিং করি সাঈদ ভাই তখনও নিয়মিত খেলোয়াড়!

সাঈদ ভাইয়ের আরেকটি পরিচয় ক্রিকেটের আড়ালে চাপা পরে গেছে। সেটি হল সাঈদ ভাই ছিলেন আমাদের শৈশব, কৈশর এবং যৌবনের প্রথমকালে আমাদের শহরের ডাকসাইটে অভিনেতা। শতাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয়ের রেকর্ড আছে তাঁর।

মাঝে বেশ কিছুদিন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের বেডে বেডে দিন কেটেছে এই “ক্রিকেটগুরুর”। সে সময় তাকে দেখতে একাধিকবার হাসপাতালে, বাসায় গেছেন, বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় এম. পি, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমসহ অনেকেই।

সাঈদ ভাই আপনি আরও বহুদিন আমাদের মাঝে থাকুন, শিশু-কিশোরদের নিয়ে ব্যাট-বল হাতে মাঠে থাকুন। মাঠে থাকার মানুষের বড় অভাব । মাঠে এখন মনিকাঞ্চন নেই, মনিকাঞ্চন সব এখন টেবিলে, টেবিলে, বক্তৃতায়।

শুভ জন্মদিন, শুভেচ্ছা, শুভ কামনা।

কড়চা/ এস এ এন

Facebook Comments
ভাগ