চেনা ডেউয়া যখন অচেনা গুনবতী/ প্রতিমা রায়বিশ্বস

ডেউয়া

আরব সাগরের পা ছুঁয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। মালা কেটে তৈরি হয়েছে পথ। শুকনো মাছের গন্ধ ছাড়ছে। না যেন কিছুতেই অগত্যা ঝা চকচকে গাড়ির ড্রাইভারকে বলতে সংকোচ লাগলেও বলে বসলাম-‘আপকা কার মে মাচ্ছী থা ক্যয়া?’

‘ন্যহী ম্যডাম এহা কা সভই আব মাচ্ছি ধূপমে ডালতা হ্য উসকা খুশবু বুদবু জোভি বোলে ওহি কাঁচ খুলা হ্যয় ইসলিয়ে।’

চারিদিক ঘন জঙ্গল কোথায় ঘরবাড়ি কিছুই তো দেখছি না। যাকগে কয়েক ঘন্টা মিনিটের তো ব্যপার। নাক বন্ধ করে মুখ দিয়েই শ্বাস যেরম নিচ্ছি নিই। অবশেষে পথ প্রান্তর জঙ্গল ফেলে রাজপুরীর মত এল বিশাল গেট। ইন্ডিয়ান নেভি। চেকিং পর্ব সেরে কোয়ার্টার। ওহ কী আনন্দ। কী অপরূপ সৌন্দর্য,হাওয়া ইত্যাদি। আমি কবি সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল গিলছি ঢোকঢোক করে। ভিতরে অসম্ভব ফুলে বড় হচ্ছে সব বর্ণমালা। ডায়রী চাই।

বিকেলে বাজারে যাচ্ছি; সকালে ভিতরের মলে যাচ্ছি; কখনও ক্যন্টিনে যাচ্ছি; কখনও সৈকতে। আমার বরাবর বাজার করতে হয়…নাহলে মনের মত কিছুই পাই না যেন রান্না করার। ভালোও লাগে যেন।

বিভিন্ন জায়গার বাজার দেখি ঘুরেফিরে। বাজারের প্রকৃতি বিভিন্ন হয় স্থান কাল নির্বিশেষে। আমার ভিতরে কী যেন একটা হয় সব দেখি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবার অদম্য নেশা। এই স্বভাব বশতঃ বেশ কয়েকদিন দেখছি বস্তায় বস্তায় কী সব যেন বিক্রি হচ্ছে। লোকজন দরও করছে। পাল্লায় ওজনও করছে। আমি প্রথমে অতটা ভ্রুক্ষেপ করি নি। পরে একদিন পুইশাক কিনছি, দেখি মহিলার অন্য পাশে সেই জিনিস ঝুরঝুরে শুকনো মত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ক্যয়া হ্যয় ইয়েসব? কী বলল কিছুই বুঝলাম না। আমার দিকে এক টুকরো বাড়িয়ে দিল আর ওদের ভাষায় খেতে বলল। আমি ভাবলাম না বাবা কাউকে বিশ্বাস নেই, কী খেতে কী খাব তুমি খাও বাবা আগে। উনি খেয়ে দেখাল আর মুখের তৃপ্তি ফুটিয়ে-‘উম বহুত আচ্ছা।’ এবার আমি সাহস করে একটুখানি ছিড়ে খেলাম। ‘ও মাই গড কী সুন্দর খেতে গো। কত করে ‘ বাংলায় বললাম। কারণ ওনার কাছে যা হিন্দি তাই বাংলা। এক মুঠো যতটুকু ততটুকু উঠিয়ে বললো,‘২৫ টাকা।’ -‘আ্যঁ এত দাম নাকি? আচ্ছা দাও তবে।’ বাড়ি আসতে আসতে ঢ্যাক করে ঢেকুর উঠল। পেটটা খালি খালি লাগছে। অনেক দিন তো এমন মনে হয় না! খিদে পায় না বলে ডক্টর দেখালাম বিশাল নামকরা। এখানের ডক্টর গিলোটী। ডাক্তার আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল,‘কী সমস্যা? খিদে পায় না। পেট ফোলা সব সময়। ওহঃ তব গ্যসকা ডাবাই দেরাহা খাও।’ সেই থেকে গ্যসের ওষুধ খেয়ে খেয়ে আছি। কিন্তু আজ তো খাই নি সকালে। বুঝলাম কী ঘটল ভিতরে।

যাইহোক ওটা ফুরিয়ে গেলে আমি আবার কিনেছি। এবার বেশি করেই কিনেছি। খেতে দেখলাম বেশ interesting আর গ্যসের সমস্যা টা নেই। বাচ্চাদেরও খাওয়াচ্ছি, হজমের কোনো সমস্যা নেই। এর সঙ্গে এখন আমি লবঙ্গ যোগ করে খাই অনেকক্ষণ মুখে রাখার জন্য। এছাড়া অন্য কারণও আছে। সেটি পরে কোনো একদিন বলব।

তো এখন আমি পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছি চাকরির পিছুটানে। জয়েন করলাম। সময়ের সাথে সাথে কিনে আনা stock ফুরিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এর ফ্যনের সংখ্যা এখন ট্রেনভর্তি। আমার পরিচিতরা। না দিলে ভিতরে ভিতরে লোল পরে ঠিক বুঝে যাই। নিরাশ করি না। দিই সামান্য হলেও। কিন্তু এদিকে তো স্টক খালি। কৌটা ঝাকিয়ে ঝুকিয়ে সামান্য একটু ছেড়া মহাছেড়া পেলেই যেন আনন্দ। মেয়েকে সমান তালে বলে যাচ্ছি-‘মাম্মা চল আমরা আবার যাই, নাহলে ঝালে শিষালে কী খাবি এবার?’ -‘ঝাল কম দিও কী আর করার বলো।’ এমন সময় মেয়ের NCC এর training আসল সেই গোয়াতে। ওহ মাই গড। কী মজা মাম্মা এবার তো আর কোনো সমস্যা নেই।

-হুম ঠিকই বলেছ।তবে আমাদের যা কড়াকড়ি বাইরে বেরুতে দেবে তো নাই, দেখব তাও বড়ুয়া স্যরকে বলে এনে দেয় কিনা।

-ঠিক আছে।

মেয়ে চলে গেল গোয়া। প্রতিদিন সব কথার পর একবার ‘এই মা বলেছিস স্যরকে?’

-‘না এখানে আমার কী অবস্থা জানো? ডেলি ফায়ারিং করতে হচ্ছে আর বোটিং ভি। গভীর সমুদ্রে যেতে হচ্ছে তাও আবার competition…first না হলে rank পাব না। আমি দেখছি তাও। এখানের একটি মেয়ে আছে যে আমার classmate ছিল। ওকে জানাব আজকে।’ বেশ। যাইহোক সেই মেয়েটির মা এনে দিল। অবশেষে হাতে পেলাম। এরপর আরও কয়েকজনকে দিয়ে আমি আনিয়েছি। কিন্তু এখন আর কেউ নেই ওখানে যারা পরিচিত ছিল সবার transfer হয়ে গেছে।
যাইহোক যার এত গুনঃ

১) gas হয় না যাই খাও একগাদা ইলিশ, কাৎলা,খাসি।

২) বদহজম হয় না গলা অবধি যাই খাও ইলিশ মুরগি গরু খাসি।

৩) মনটা কেমন ফুরফুরে থাকে যেন এর একটা টকটক নুননুন স্বাদের জন্য হয়ত হবে।

৪) খুব ঝাল খেলে এটা একটু খেলেই ঝাল কমে যায়।

এত গুন যার তাকে কেউ হাতছাড়া করতে চায়? কিন্তু আসলে ফলটা কী আমি জানিই না তখনও অবধি। ওরা নাম বলে কিন্তু কী একটা লম্বা উল্টোপাল্টা বুঝি না, মনেও থাকে না। সে নেই তা অনেক দিনই হল। হঠাৎ দেখি ভাবনা ফোন করেছে। ও ওখানকার মেয়ে। আমি বললাম, এতদিন পর ফোন করলি সম্রাজ্ঞীর নম্বর তোর কাছে ছিল? -না আন্টি সুজনের কাছে ছিল ও আমাকে দিয়েছে।

-তো বাবা আমাকে একটি জিনিস পাঠিয়ে দিবি আচ্ছা কী নাম রে বাবু ওর?

-হুলি।

ঠিক আছে দেখি Google কি দেখায়? আজ দেখব। নিশ্চয়ই দেখাবে, এত বিক্রি হচ্ছে, দেখানো তো উচিত। সত্যিই তাই search করতেই বাবু বেড়িয়ে এলেন বাংলার ব্রাত্য ফল ডেউয়া।

কড়চা/ পি আর বি

Facebook Comments
ভাগ