পূর্ণতায় ভরে উঠুক শ্রেণিকক্ষের পাঠদান/ রুহুল ইসলাম টিপু

পূর্ণতায় ভরে উঠুক শ্রেণিকক্ষের পাঠদান

রুহুল ইসলাম টিপু

দীর্ঘ বিরতির পর শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি স্মরণীয় দিন। পূর্বের রাতে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করি। সদর উপজেলার পাছবারইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়া সূত্রধর জানালেন তিনি দ্রুত ঘুমাতে যাবেন। ১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭ টার মধ্যে স্কুলে পৌছতে হবে। ঢাকাইজোড়া হাজী কোরবান আলী মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউশন এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খোরশেদ আলম ফেসবুক পেজে স্কুলের ধোয়া মোছা স্বাস্থ্যবিধির বিভিন্ন নির্দেশাবলীর ছবি পোস্ট দিলেন। আনন্দ এবং উৎকন্ঠা দুটিই ছিল শিক্ষক খোরশেদ আলম এর মাঝে।

আমার গ্রাম মান্তা’র স্কুলের মাঠে পানি। শিক্ষার্থীরা আসবে নৌকায়। শিক্ষক শিক্ষিকাবৃন্দ সহ সকলেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে অভিবাদন জানানোর পরিকল্পনা তুলে ধরলেন। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ অন লাইনে আপলোড ডেইলী স্টার-এ নিজস্ব সংবাদদাতার বরাতে একটি সংবাদে মারাত্মকভাবে আহত হই। বন্যার কারণে মানিকগঞ্জে ২৭ স্কুল খুলছে না আগামীকাল (১২ সেপ্টেম্বর ২০২১)। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার অধিকারী বলেন, জেলায় মোট ৬৫২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে হরিরামপুর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলার ২৫ টি বিদ্যালয়ে বন্যার পানি জমে আছে। হরিরামপুর উপজেলার সুতালড়ি ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা জাহান ডেইলি স্টারকে বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এই জেলায় মোট ২৩২টি প্রতিষ্ঠান আছে। দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়টি গতবার নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় কিছুটা সমস্যা আছে। ঢেউটিনের ঘরে স্কুলটির কার্যক্রম চলছে। বন্যার পানি নেমে গেলেও স্কুল মাঠে কাদা জমে আছে। আরো জানা যায়, যমুনা নদীর পাড়ের দৌলতপুর উপজেলার হাটাইল, টুটিয়াম, আহুলিয়া, বহড়া, গাজীছাইল, মীর কুটিয়া, নিলুয়া ও হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর, সুতালড়িসহ চরাঞ্চলের অধিকাংশ স্কুলে বন্যার পানি উঠেছিল।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ এ বিবিসি বাংলা’র একটি সংবাদের প্রতি নজর কাড়ে। এতে জানা যায়, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং কলেজ ঐক্য পরিষদ দাবি করছে সারা দেশে প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল। সেখানে প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষক প্রায় ১ কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করে আসছিল। ঐক্য পরিষদ দাবি করছে ১০ হাজারের মত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকার পপুলার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক আমেন বেগম তামান্না বলছেন, স্বল্প সংখ্যক শিক্ষক নিয়ে শুরু করলেও এখন স্কুলে শিশুদের ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। মিস তামান্না’র উক্তি, ‘আমার স্কুলের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ স্টুডেন্ট বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আমি নিজে ৩০টি পরিবারে গিয়েছি স্কুলে আসার জন্য তাদের অভিভাবকদের রাজি করাতে। কিন্তু তারা নিম্নবিত্ত পরিবারের। ফলে কাজ থেকে তারা আর স্কুলে ফিরবে না। এখন স্টুডেন্ট যদি না আসে তাহলে আমি স্কুল চালাবো কীভাবে।’

চট্টগ্রামের ভিশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলছেন, ২১ জন শিক্ষক এবং সাড়ে ৪ শত শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুল চলছিল। গতবছর রোজার সময় আমরা সরকারের নির্দেশ মতো অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাইনি। ঘর ভাড়া, গ্যাস ও কারেন্ট বিল, শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন- এসব কুলিয়ে উঠতে না পাড়ার কারণে ২০২১ সালে এসে আমরা স্কুলটা বন্ধ করতে বাধ্য হলাম।’

১৮ মাস পর ক্লাসে ফেরার আনন্দ যেমন জাতি উপভোগ করেছে। একইসাথে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে না পারা কিংবা স্কুলটিই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া; ঝড়ে পড়া; বাল্য বিবাহসহ এরূপ নানাবিধ প্রতিকূলতা আমরা পেলাম কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস হতে। আমাদের প্রিয় অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেন, একটি বাচ্চা যদি স্কুলের অন্য বাচ্চার কাছ থেকে করোনার বাহক হয়ে বাড়ি ফিরে তাহলেই বিপদ। দীর্ঘসময় নিজেকে গুটিয়ে, নিরাপদে থাকা বাড়ির বয়স্ক মানুষটির জন্য সেটি মহাবিপর্যয়ের। স্কুল কলেজের স্টুডেন্টদের বলে কয়ে বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের থেকে দূরে রাখা যাবে। সমস্যাটা এরা বুঝবে। কিন্তু প্রাইমারি লেভেলের শিশুটা তা বুঝবে না। অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু তাঁর লেখায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়েও আলোকপাত করেন। আমরা অভিভাবকবৃন্দ এখন শিশুদের নিয়ে ভীষণ চিন্তিত এবং আতঙ্কিত। কখন কি হয়। প্রথম দিনের চিত্রে শিশুদের চেয়ে অভিভাবকদের নিয়ম ভঙ্গের প্রবণতা বেশি দেখা গিয়েছে। শিশুদের নিয়ে ছবি তোলা। মাস্ক খুলে ফেলে কোলে তোলা কিংবা স্কুলের করিডোরে বা রাস্তায় জটলা। সবই স্বাস্থ্যবিধিকে হুমকি’র মধ্যে ফেলে দেয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, শিক্ষা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণেই প্রথম দিনের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রম সফল হয়। মনিটরিং কার্যক্রমের পদ্ধতিই পারবে এ সফলতা কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে। মাইশি’র নিকট সন্ধ্যার মধ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট প্রদান সেরূপ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

পাছবারইল প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে আমার আগ্রহ বেশি। কারণ আমি শিক্ষক জয়া সূত্রধর এর মাধ্যমে একটি ছাত্রের চিঠি পেয়েছিলাম। যেখানে ছাত্রটি আকুতি করে শিক্ষককে বলেছিলেন ক্লাস নিতে। এ ছাত্রটি আমার চোখে ৪ কোটি শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি। সবাই শ্রেণিকক্ষে যেতে চায়। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ খুলে দেওয়া হলো দেশের মেডিকেল এবং নার্সিং কলেজগুলোকে। ১৫ অক্টোবর ২০২১ থেকে খুলবে পাবলিক এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ছাত্রটি চিঠিতে তার সাহস ও শিক্ষা অধিকারের কথা উল্লেখ করে। শিক্ষা গ্রহণের ঐকান্তিক ইচ্ছার অভিলাষ ব্যক্ত করে। তার সাহসের প্রশংসা জানাই।

শিক্ষক জয়া সূত্রধর এর ফেজবুক পাতার অংশ বিশেষ তুলে ধরছি। তিনি লিখেন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে অলঙ্কৃত হয়ে থাকার একটি দিন। সকাল ৯ টায় শিক্ষার্থীরা তাদের আরাধ্য বিদ্যাপীঠে প্রবেশাধিকার ফিরে পেল। বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার। শিক্ষক জয়া সূত্রধর অনলাইন পরিদর্শনে হোস্ট হিসেবে পুরো কার্যক্রম উপভোগ করেন। ক্লাসের আসন বিন্যাস করা হয় ইংরেজি জেড অক্ষরের ন্যায়। দীর্ঘদিন পর প্রথম ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলনে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আবেগ এবং অনুরাগের বহি:প্রকাশ ঘটলেও মাথায় হাত রেখে শান্ত করার বা নির্ভরতার স্পর্শের সুযোগ ছিল না। এটিই ছিল স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা। অনিয়ম নেই, চপলতা নেই, বিশৃঙ্খলা নেই। যে সকল শিক্ষার্থীরা সশরীরে উপস্থিত ছিল না তাদের জন্য যথারীতি চলে গুগল মিট ক্লাস। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর অতর্কিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। মানিকগঞ্জ শহরের বাইরে নবগ্রাম ইউনিয়নের গ্রামের একটি স্কুল। একই আয়োজন ছিলো পুরো দেশ ব্যাপী। বিস্ময় জাগানো স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান। আমাদের সক্ষমতা আর হেলাফেলার বিষয় নয়। শিক্ষাকে উন্নত করতে আমরা পিছপা হবো না। এ অঙ্গীকার সকলের। করোনা এবং ডেঙ্গুকে জয় করে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কার্যক্রম শতভাগ সফল করার জন্য দেশবাসী প্রস্তুত। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে হবে। রোধ করতে হবে বাল্যবিবাহ। দুই বছর শিক্ষার ক্ষেত্রে অভাবনীয় যে ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে সেটি পূরণ করতেই হবে। এসব ক্ষেত্রে দেখতে চাই দৃশ্যমান সুপরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন। মেধা এবং যোগ্যতায় আমরা পিছিয়ে থাকতে চাই না। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন এবং গ্রামভিত্তিক কার্যক্রমের উপর আরও জড়ালো কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

সকল শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দকে অভিনন্দন। আমরা চাই পূর্ণতায় ভরে উঠুক বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ