ফেরি পারাপারে সময় বেশি, বিপর্যস্ত পাটুরিয়া ঘাট

বিশেষ প্রতিনিধিঃ নদীতে প্রবল স্রোত, মাওয়ায় ফেরি সার্ভিস বন্ধ, যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি এবং ফেরি স্বল্পতা ও স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে সময় বেশি লাগায় গত কয়েকদিন ধরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের ফেরি সার্ভিস। যাত্রীবাহী বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি পারের সুযোগ বেশি থাকার কারণে পণ্যবাহী ট্রাক দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও পার হতে পারছে না। পণ্যবাহী ট্রাক পারের জন্য ৩/৪ দিন অপেক্ষা করে টিকিট মিললেও ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পাটুরিয়া ঘাটে পারের জন্য আসা শত শত পণ্যবাহী ট্রাকের শ্রমিকরা।

ট্রাক চালক শেখ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, গত সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী স্কেলের কাছে ১ দিন এবং উথলী মোড়ে ১ দিন মহাসড়কের ওপর পুলিশ গাড়ি আটকিয়ে রাখার ২ দিন পর পাটুরিয়া ট্রাক টার্মিনালে পৌঁছাই। এখানে তিনদিন ধরে ফেরি পারের অপেক্ষায় রয়েছি। রাস্তায় দু’দিন এবং ঘাটে আসার পর ৩ দিন অতিবাহিত হলেও রোববার সকাল পর্যন্ত তিনি ফেরির টিকিট পাননি।

আরেক ট্রাক চালক হাফেজ আলী জানান, তিনি চার দিন ধরে পাটুরিয়া ট্রাক টার্মিনালে ফেরি পারাপারের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। রোদে পুড়ে আর বৃস্টিতে ভিজেও ফেরি কর্তৃপক্ষের একটু সহানুভুতি পাননি তারা।

চালক হাসেম আলী বেলেন, ফোনে ফোনে গাড়ি পার হচ্ছে। কিন্ত আমরা সিরিয়াল নিয়ে টার্মিনালে দিনের পর দিন বসে আছি। আমরা স্কেল করে পার হতে পারছি না। কিন্ত ডানে-বামে অনেক গাড়িই ইর্মাজেন্সি দেখিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থা অব্যাহত থাকলে এবার তাদের কোনবানির ঈদ করা কষ্ট হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন ট্রাক শ্রমিকরা। করোনার কারণে গাড়ির ভাড়া কম। আবার গাড়ির ট্রিপ সংখাও কমে যাচ্ছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বোয়ালী ব্রীজের কাছে আটকে থাকা ট্রাক শ্রমিক হালিম মিয়া বলেন, শনিবার রাত ৯ টায় ট্রাক নিয়ে এই ফাঁকা স্থানে আছেন। এখানে কোন হোটেল নেই, আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছি না। ফাঁকা জায়াগায় রাতের বেলায় মালামাল চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে ঘুমাতে পারছি না। খুব কষ্টে আছি আমরা। হালিমের মতো আটকে পড়া অনেক চালকরাই একই রকম কষ্টের কথা জানালেন।

সরজমিনে পাটুরিয়া ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, মুল টার্মিনালটি গাড়িতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। পা ফেলানোর জায়গা নেই। কিন্তু লঞ্চ ঘাটের উত্তর পার্শ্বের ট্রাক টার্মিনালটি ফাঁকা রয়েছে। ঘাট এলাকা থেকে পাটুরিয়া-ঢাকা মহাসড়কের দু’পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এক সারিতে যাত্রীবাহী বাস, অপর সারিতে পণ্যবাহী ট্রাক রয়েছে। আরসিএল মোড় থেকে নালী বাজারের রাস্তা হয়ে ৫ নং ঘাট এলাকা পর্যন্ত মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারসহ ছোট গাড়ির দীর্ঘ লাইন। ফেরি পার হতে ঘাটে আসা এসব যানবাহনগুলোকে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

পাটুরিয়া ট্রাক টার্মিনালে ট্রাক শ্রমিক নিজেরাই সিরিয়াল ব্যবস্থা পরিচালনা করার চেষ্ট করছে। কিন্তু অন্যান্য ট্রাক শ্রমিকরা তা মানতে চাচ্ছে না। ফলে এসব স্থানে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের হওয়ার পথে কোন ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকায় ট্রাক শ্রমিকরা কোন সিরিয়াল মানছে না। এরা হুড়োহুড়ি করে এক সাথে টার্মিনাল থেকে বের হয়ে ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছে। এতে এক গাড়ির সাথে আরেক গারির সংঘর্ষ হচ্ছে। এতে চাপ লেগে গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন অনেকে। এনিয়ে প্রতিনিয়তই ট্রাক শ্রমিকদের মধ্যে জটলা বাঁধছে।

এদিকে ঘাট এলাকায় যানজট মুক্ত রাখতে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে পাটুরিয়া ঘাটে প্রবেশ করতে না দিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী এলাকায় এবং উথলী মোড় থেকে আরিচা ঘাটের দিকে মহাসড়কের উপর সারিবদ্ধভাবে আটকিয়ে রাখছে পুলিশ। রোববার সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উথলী মোড় থেকে আরিচা ঘাট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পণ্যবাহী ট্রাকের সারি দেখা গেছে। মূল্যবান পণ্য নিয়ে এভাবে খোলা আকাশের নীচে মহাসড়কের ওপর ফাঁকা জায়গায় থাকতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এসব ট্রাক শ্রমিকরা। এছাড়া খাবার সংকটসহ নানা ধরনের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে রাস্তার ওপর আটকে থাকা ট্রাক শ্রমিকদেরকে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে গত কয়েকদিন ধরে ফেরি সার্ভিসে এ অচলাবস্থা চলছে। এব্যাপারে শিবালয় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানিয়া সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ৫/৬ দিন ধরে ফেরি পারের জন্য অপেক্ষা করছে চালকদের এ কথা সঠিক নয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ও আনসার ঘাট এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। সিরিয়ালের বাইরে ফেরিতে যানবাহন পারের কোন রকম সুযোগ নেই। সকল ধরনের গাড়িই সিরিয়াল মোতাবেক পার করা হচ্ছে। তবে যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, এ্যাম্বুল্যান্সসহ পঁচনশীল জরুরী পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিত্বে পার করা হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিপুটি জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমান জানান, মাওয়ায় ফেরি সার্ভিস বন্ধ, যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি, ফেরি সংকট এবং নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি সার্ভিসের এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ৬টি রো-রো এবং ৭ টি ইউটিলিটি ফেরি রয়েছে এ নৌরুটে। ঈদুল আযহার জন্য তাদের যথেষ্ট প্রস্তুুতি রয়েছে। ঈদের সময় ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হবে। আরো দু’টি রো-রো ফেরি এ বহরে যোগ হলে এ সমস্যা থাকবে না বলে তিনি জানান।

Facebook Comments Box
ভাগ