মহাকাশ যাত্রা/ আয়েশা স্নেহা

আয়েশা স্নেহা

জ্যোতির্বিজ্ঞান বা Astronomy হচ্ছে বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরাতন শাখাগুলোর মধ্যে একটি। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান সীমায়িত ছিল খালি চোখে দৃশ্যমান মহাজাগতিক পদার্থের পর্যবেক্ষণ ও সেগুলোর গতিবিধি সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে। এ বিজ্ঞানে গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, ছায়াপথ ও ধূমকেতু ইত্যাদির মহাজাগতিক এবং অতিনবতারা ও এসবের বিস্ফোরণ, গামা রশ্মি বিচ্ছুরণ ও অনুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণের ঘটনাবালি এবং বিবর্তনের ধারাটিকে গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসানের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা করা হয়।

রেনেসাঁর সময় নিকোলাস কোপারনিকাস সৌর সিস্টেমের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী বিজ্ঞানীরা তার কাজকে প্রসারিত এবং সংশোধন করেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং জোহানেস। গ্যালিলিও তার পর্যবেক্ষণকে উন্নত করার জন্য টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছিলেন। কেপলারই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সূর্যকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গ্রহগুলোর গতির বিষয়টি সঠিকভাবে বর্ণনা করেছিলেন। কেপলার তার বিজ্ঞানভিত্তিক আবিষ্কারকে তেমনভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। এক্ষেত্রে নিউটন নিয়ে এলেন আধুনিক গতি বিদ্যার একটি নতুন অধ্যায় এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির থিওরি।

মানুষ জানতে পারে পৃথিবীর ছায়াপথের অস্তিত্ব নীহারিকাকে। নক্ষত্রগুলোর বাইরে পৃথক দল হিসেবে ছায়া পথের অস্তিত্বও আজ অজানা নয়। গ্যালাক্সির উপর ছিল বিজ্ঞানীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। আবিষ্কার হলো মহা বিশ্বের সম্প্রসারিত অসংখ্য বিজ্ঞানের বিষয়।

মহাকাশ নিয়ে গবেষণা চলছেই। নতুন নতুন বিষয়গুলো উম্মোচন এবং আবিষ্কার হচ্ছে। অজানাকে উদঘাটনের জন্য এই সকল অভিযান। মহাকাশ সম্পর্কে রয়েছে অসংখ্য অজানা রহস্য এবং তথ্য। মহাবিশ্বে ১০০ বিলিয়নেরও বেশি ছায়াপথ রয়েছে। বড় ছায়াপথগুলোর প্রতিটিতে নক্ষত্র রয়েছে ৪০০ বিলিয়ন করে। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে মোট নক্ষত্র ১০০ বিলিয়ন। আমাদের সৌর জগতের সবচেয়ে বড় সদস্য সূর্য। ১০ লাখের বেশী পৃথিবী একত্র করলে সেটি সূর্যের সমান হবে। সৌর জগতের মোট ভরের ৯৮ শতাংশ সূর্যের দখলে। মহাবিশ্বে যে স্থানে কোন কিছু নেই, তার তাপমাত্রা ২.৭ কেলভিন বা মাইনাস ২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, ১৪ টি ব্ল্যাক হোল আছে, সবচেয়ে নিকটবর্তী ব্ল্যাক হোলটির নাম সিগন্যাস এক্স-১। এটি আমাদের থেকে ৮ হাজার আলোক বর্ষ দূরে।

গোড়ার কথা যেটি আমাদের ভাবায়. মহাকাশ সৃষ্টি হলো কিভাবে? এটির ভিত্তি মহাবিস্ফোরণ উৎপত্তি তত্ত্ব। আজ থেকে প্রায় ১৩.৭৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে এই মহা বিশ্ব একটি অতি ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক নভোচারী বিশ্বাস করেন যে, ৪৫০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহের জন্ম। নীহারিক তত্ত্ব মতে বরফ, বাষ্প এবং ধূলিকণা সমন্বয়ে গঠিত আমাদের মহাকাশ। বাষ্পের মূলে রয়েছে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম।

মিল্কি ওয়ে’র ছবি

১৯৬৫ সালের ১৮ মার্চ সোভিয়েত অ্যালেক্সেই লেনড সর্বপ্রথম মানুষ যিনি মকাকাশে ১০ মিনিট ঘুরেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নিল আমর্সট্রং প্রথম চাঁদে পা রাখেন। ১৯৯৭ সালের ০৬ জুলাই মঙ্গলে পাঠানো হয় সোর্জনায় নামক একটি রোবট।

মকাকাশের রহস্য উদঘাটনের জন্য মানুষ অনেক রকমের প্রচেষ্টা করেছে। তবে সকল অভিযানই যে সফল হয়েছে, এমনটা নয়। ১৯৬৭ সালের ২৩ জানুয়ারি এক ত্রুটির কারণে আগুন লেগে যায় অ্যাপোলো-১ এ। এ কারণে তিন নভোচারী ভার্জিল গুস, এড হোয়াইট ও রজার শ্যাফে মারা যান। এই মহাকাশে মানুষ গড়েছে রেকর্ড। ১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর রাশিয়ার মির নামক স্পেস ষ্টেশনে এক বছর থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন মুসা মানারেভ ও ভ্লাদিমির তিতোভ। আর তাদের এই রেকর্ড ভাঙেন ভ্যালরি পলিয়াকেভ। ১৯৯৫ সালের ২২ মার্চ তিনি ৪০৩ দিন ১৮ ঘন্টা কক্ষ পথ পার করে পৃথিবীতে ফেরেন।

মহাকাশে প্রথম নারী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেনতিনা তেরেস্কোভা এক স্পুটনিক-৬ এ মহাকাশ পাড়ি দিয়ে ছিলেন ১৯৬৩ সালে। ১৯৯৮ সালের ২৯ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে মহাকাশে পা রাখেন জন গ্লেন। মহাকাশে পাঠানো প্রথম প্রাণী লাইকা, একটি কুকুর। স্পুটনিক-২ তে করে তাকে পাঠানো হয় মহাকাশে। ১৯৬১ সালে স্ট্রেলকা নামের একটি কুকুর মহাকাশে একদিন কাটায়। গবেষণা অভিযানের মধ্য দিয়ে আবিষ্কারের ইতি হবে না কোনদিন, এটি চলতেই থাকবে। মানুষের মধ্যে রয়েছে প্রবল আকাঙ্খা। মানুষ জানতে চায়। রহস্যের ভিতর থেকে সে চায় সত্যকে বের করতে, অজানা তথ্যের সন্ধানে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুকে দ্বিধা না করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মহাকাশে পাঠিয়েছে তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতি আমাদের নজরে পড়ছে। বড় দুঃখ আমার জানা মতে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক ফ্যাকাল্টি নেই। আজ স্যাটেলাইট নির্মাণ এবং প্রক্ষেপণ এর জন্য আমাদের অন্য দেশের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আগ্রহী। তাদেরকে প্রধানত: বৈদেশিক বৃত্তির উপর নির্ভর করতে হয়। আমার ভুলও হতে পারে, মহাকাশ বিজ্ঞান সংক্রান্ত কোন প্রতিষ্ঠানও নেই এ দেশে। আমার স্বপ্ন দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হবে মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণাগার এবং বাংলাদেশও পাড়ি জমাবে মহাকাশে, সেটি হবে আমার এবং সকল নাগরিকের অহংকার।

আয়েশা স্নেহাঃ দশম ম্রেণির শিক্ষার্থী, প্রাইম ব্যাংক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, উত্তরা, ঢাকা।

Facebook Comments
ভাগ