মান্তা’র নৌকা বাইচ/ রুহুল ইসলাম টিপু

মান্তা’র নৌকা বাইচ

রুহুল ইসলাম টিপু

বাড়ি যাচ্ছি। কালিগঙ্গা নদী। বেউথা ঘাট। নৌকা নেই। ট্রলার আছে। একা যেতে ভাড়া গুনতে হবে বেশি। সাধারণ যাত্রী নিয়ে ট্রলার যায় না। মানুষ যাতায়াত করেন ব্যাটারি চালিত অটো গাড়িতে। নৌকা বাইচ। অথচ যাবো অটো বাইকে। বেশ বেমানান। বাবা’র কথা মনে পড়লো। ভাদ্র মাস এলেই মান্তা যাওয়া। উদ্দেশ্য হেলাচিয়ার নৌকা বাইচ। নৌকায় দিঘুলিয়া অথবা ঘোস্তা খাল দিয়ে বাড়িতে যাওয়া। দিঘুলিয়া খালে পানি আসে ভরা বা অতি বর্ষায়। বাড়িতে দাদু চাচীরা এদিন তালের পিঠার আয়োজন করেন। সাথে থাকে অন্যান্য নানান রকমারি খাবার। পিঠাপুলি তো থাকবেই। দাদীকে আমরা দাদু বলি। এ ধারা আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও এখন প্রচলিত। ছেলেমেয়েরা আমার বাবাকে আবার দাদা ডাকে। আদরের ব্যক্তিদের সোহাগ করে বিভিন্ন সম্বোধন করার ক্ষেত্রে এক ধরনের মজা রয়েছে। আমরা দাদাকে পাইনি। বাবা কাকা’রা ছোট বেলায় দাদাকে হারান। আমাদের বাবা এবং কাকাদের নিয়ে দাদু’র সংসার ছিল বড়ই পরিপাটি। ঈর্ষণীয় সুখ এবং আনন্দে ভরা বাড়ি। দাদা’র বাড়ির সুখ বিলাস গ্রামবাসীরা এখনও স্মরণ করেন। আমার মনে বেশ গর্ব এবং অহংকার এসে ভর করে। একটু বেশি টাকা খরচ করে ট্রলারেই যেতে ইচ্ছে করে। তবে মাঝি অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় ট্রলার বাদ দিয়ে বসি অটো বাইকে। ৮ জন যাত্রী নিতে হবে। আমার অনুরোধে চালক বাইক ছেড়ে দিলো। যাত্রী কম পড়লে বাকি টাকা আমি দিবো এ প্রতিশ্রুতিতে। দিঘুলিয়া যেতেই পড়ি ভাঙ্গা খানাখন্দ সড়কে। পত্রিকায় ফেসবুকের মাধ্যমে দিঘুলিয়া সড়কের বিড়ম্বনার কথা দেশবাসি অবগত। উন্নতির কোন ইঙ্গিত নেই। নৌকা বাইচের আনন্দে যন্ত্রণাও এখন আর কষ্টের নয়।

মান্তায় প্রথম নৌকা বাইচ। গ্রামের যুব সমাজ উদ্যোগী হয়ে আয়োজন করে। করোনায় পিষ্ট আমরা সবাই। একটু উন্নতিতেই হাফ ছেড়ে অনেক কিছু করার ইচ্ছে সকলকে তাড়িত করে। মান্তা হচ্ছে ক্রীড়া শিল্প মেলা পার্বণের গ্রাম। এ গ্রাম কৃষ্টি সংস্কৃতিতে শত বর্ষের ঐতিহ্য বহন করছে। শীতকালে ঘোড়া-গরু দৌড় প্রতিযোগিতা। পৌষ সংক্রান্তির মেলা। মহান সাধক হযরত কানু প্রামানিক (রহঃ) এর মাঝার শরীফ। প্রতি বছর পালন করা হয় ওরস ও শিরনী। এতে অংশগ্রহণ করেন সকল ধর্মের নারী পুরুষ। এ মিলন মেলাকে কেন্দ্র করে মান্তায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। চলে মাসব্যাপী। আয়োজন করা হয় পালাগান। জারি সারি মুর্শিদী মারফতিসহ লোকজ সঙ্গীত ও সুরের আবহ। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীবৃন্দের উপস্থিতির সাথে দর্শক সমাগম হয় জেলার সর্বত্র হতে। এমনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে সাধক মুণি ঋষিরাও চলে আসেন। মান্তা তখন হয়ে উঠে আরও আরাধ্য ও পবিত্র। এতো শীতের মান্তা। বর্ষায় মান্তা সেজে উঠে অপূর্ব রূপ নিয়ে। গ্রামের মধ্যে বিশাল এক মাঠ। বর্ষা শুরুর পূর্বেই আয়োজন করা প্রতিবছর ফুটবল খেলার। মানিকগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চলে আসে ফুটবল দল। তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফুটবল আয়োজনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে জেলার সর্বত্র। দর্শক সমাগমে ভরপুরে মান্তা হয়ে উঠে উচ্ছ্বসিত।

এরপর আষাঢ় মাসে চলে আসে বর্ষার পানি। টুইম্বুর জলরাশি গ্রামের বাড়ি ও পাড়াগুলোকে বানিয়ে দেয় এক একটি দ্বীপ। মাঠের চারদিকে পাড়ায় পাড়ায় আমাদের ঘর বাড়ি। এক পাড়া হতে অন্য পাড়ায় যেতে প্রয়োজন নৌকা। বড় পাড়া, মধ্য পাড়া, টেক পাড়া, উত্তর পাড়া। এরকম অনেক পাড়া বেষ্টিত গ্রাম। প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে এক বা একাধিক নৌকা। নৌকাও আবার অনেক রকমের যেমন ডিঙ্গি নৌকা, বড় নৌকা, বিভিন্ন আকার প্রকারের নৌকা। বিচিত্র সব নাম। অনেক কিছু আজ বিস্মৃত। নৌকায় হাটে যাওয়া। গঞ্জে যাওয়া। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত। মেয়ের বাড়ি, আত্মীয়কে দেখা বা বেহাই এর নিমন্ত্রণ রক্ষা সবই চলে নৌকা দিয়ে। নৌকায় ভাসতে ভাসতে গান এবং সুর সেতো আর এক অধ্যায়। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু হারালেও মান্তায় এ চর্চা লক্ষ্য করা যায়। এ আনন্দ গাড়ি ধূলার রাজপথ থেকে স্বাতন্ত্র্য। তরুণ গ্রামবাসী উদ্যোগী হয়ে বাড়ি-ঘাটের নৌকা দিয়েই বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেদিন ছিল ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার। পুটাইল ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান আমার ভাই আব্দুল জলিল মোল্লা চলে আসেন। স্থানীয় ইউপি মেম্বারসহ আশে পাশের গ্রাম হতে চলে আসা দর্শক সমাগমে ভরপুর মাঠ টুইম্বুর পানি। চারিদিকে নৌকা আর নৌকা। মাঠের দক্ষিণ পশ্চিম কোণ থেকে বাইচ শুরু। শেষ হয় উত্তর পূর্ব কোণ পর্যন্ত। সকালে ছিল সাঁতার প্রতিযোগিতা। চোখ ধাঁধানো উপভোগ্য বাইচ এবং সাঁতার প্রতিযোগিতা।

নৌকা বাইচ হচ্ছে শারীরিক কসরত এবং নান্দনিক শিল্প। মাঝি-মাল্লাবৃন্দ প্রচন্ড পরিশ্রমী। তাল-লয় ঠিক রেখে ছন্দ বদ্ধভাবে তীব্র গতিতে এগিয়ে চলা। লক্ষ্য নৌকাকে প্রথম হতেই হবে। মাঝি ধরে আছেন হাল। অভীষ্ট দৃষ্টি। দর্শকের হাত তালি। সারি সারি রব। এগিয়ে যাওয়ার তীব্র চিৎকার। চোখ জুড়ানো আনন্দ উল্লাস। গন্তব্যে এসে বিজিত নৌকার মাঝি শোক বিহ্বল। রাগে দুঃখে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন পানিতে কিংবা ডুবিয়ে দিচ্ছেন নৌকাকে। সবই নৌকা বাইচের অংশ। কখনও কখনও আবেগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে; হেরে যাওয়ার পক্ষদের। বৈঠা দিয়েই ধুম-ধাম আঘাত প্রদানও বাদ পড়ে নি। জয়ী দলের উল্লাস দেখার মতো। পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন আয়োজক মান্তাবাসি। প্রতিযোগিতা লক্ষ্য এবং এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ভালো নেতৃত্ব। দাড় হাতে পিছনে যিনি ভালো নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। সে নৌকাগুলোই প্রতিযোগিতায় ভালো করে এবং বিজয়ী হয়েছে। বিজয়ী এবং বিজিত এর ফাঁরাক যে খুব বেশি থাকে, তেমন নয়। একটি প্রতিযোগিতায় টাইও হয়। সমান সমান। পুনরায় বাইচ দিয়ে পুরস্কার নিতে হয়েছে। কী অপূর্ব দৃশ্য। দেখার মতো। মনে রাখার মতো। এটি একটি দলগত প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার শেষ পর্বে ঘটে আনন্দের আরেক দিক উপস্থিত হয় বিশাল এক বাইচের নৌকা। দর্শক শ্রোতারা আনন্দে উল্লসিত হয়ে পড়ে। বড় নৌকা পরপর তিন চার বার বাইচ দিয়ে সকল মানুষের মন জয় করে নেয়। আমরা আরও গর্ব অনুভব করি বড় বাইচের নৌকার প্রধান মাঝি আমাদের গ্রামের ছেলে আক্তার। তার অনুরোধেই বাইচের নৌকা আসে মান্তায়। আয়োজনের সফল দিক মান্তা গ্রামবাসী’র ঐকান্তিক আগ্রহ এবং সাংগঠনিক তৎপরতা। নিখুঁত নৌকা বাইচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে মান্তার দক্ষতা সকলে উপলব্ধি করে। মান্তার অগ্রযাত্রার সফলতায় গ্রামবাসী সকলকে সামিল করতে চায়। ৬৮ হাজার গ্রাম মান্তা’র ন্যায় আনন্দ উৎসবে ভরপুর হয়ে উঠুক। নির্মল সুখ-শান্তিতে সমুন্নত হোক প্রিয় বাংলাদেশ।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ