মির্জাপুরের পথে ভাঙ্গলো মধুর মিলন মেলা/ শ্যামল কুমার সরকার

মির্জাপুরের পথে ভাঙ্গলো মধুর মিলন মেলা

শ্যামল কুমার সরকার

মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার নিভৃত জনপদ পাড়াগ্রামের মন্ডল বাড়িতে কোনো এক ভোরে পৃথিবীর মুখ দেখা সেই ছোট্ট ছেলেটি কালের স্রোতে ভাসতে ভাসতে ভরা যৌবনে এসে হাজির। লেখাপড়া শেষ করে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে কর্মরত। সে তখন রীতিমত বিয়ের বাজারে আলোচিত নাম।

অন্যদিকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের তরফদার বাড়িতে বেড়ে উঠেছে এক রাজকুমারী। কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু তাঁদের যে দেখা হতেই হবেÑএকসাথে জীবন কাটাতেই হবে। এই তো বিধির বিধান। আর সেই বিধাতার ইশারাতেই হাজির পাত্র মানব কুমার মন্ডলের প্রতিবেশী ঘটক শ্যামল বিশ্বাস। পাত্রের বাবা-মাকে পাত্রী যুথী তরফদার ও তার পরিবার সম্পর্কে নানান ইতিবাচক কথা বলেই যাচ্ছেন। অবশেষে সিদ্ধান্ত পাত্রী দেখার। একেবারেই অনানুষ্ঠানিক ভাবে তা সম্পন্ন হয়। এরপর হয় পাত্রীর বাড়িতে আনুষ্ঠানিক প্রথম পর্বের কার্যক্রম।

এক সপ্তাহ পরে পাত্রের বাড়িতে একই দশা। এরপর দু’পক্ষের প্রস্তুতি। দ্রুত সময় যেতে থাকে। পাত্র-পাত্রী থাকে অধীর অপেক্ষায়। টুকটাক যোগাযোগও তাঁদের হয়। তবে সাক্ষাতে নয়। অপেক্ষা সেই শুভ দিনের, সেই কাঙ্খিত ক্ষণের।
এবার সময় যেন সত্যিই দ্রুত ফুরিয়ে যায়। বিয়ের ঠিক আগের দিন। দু’পক্ষের বাড়িতেই হলুদ কোটার কাজ শুরু হয়ে যায়। এ নিয়ে পাত্রীর বাড়িতে ব্যাপক হৈচৈ। এছাড়া সেদিন পাত্রীর অঙ্গে জীবনে প্রথম সাদা-শুভ্র শাখা (শঙ্খ) স্থান পায়। উলুধ্বনির মাধ্যমে পাত্রীর দু’হাতে দু’জোড়া শাখা বাসা বাধে চিরতরে (এপার ওপার বাংলার অনেক বিবাহিতা নারীবাদীরা যা বর্জন করেছে)।

ঠিক পরের দিন বিয়ে। কাক ডাকা ভোরে পাত্রের বাড়িতে অধিবাসের ঢাকের শব্দ। সাথে উলুধ্বনি। সে অন্য রকম পরিবেশ। দুপুরে পাত্রকে স্নান করাতে সখীদের কলসী কাখে পুকুরে যাত্রা। সাথে ব্যান্ড পার্টি ও নাচানাচি। পুকুর ঘাটে কলসী কাখে আমাদের ছোট দিদিমা সুন্দরী লক্ষী দেবী ও সুন্দরী ময়নার কোমর দোলানো নাচ এবং কনিকা, তনু, পল্লবী, শ্যামল সহ অন্যান্যদের মনমাতানো নৃত্যে প্রকৃতি নেচে উঠে। আশ পাশের মানুষেরা ছুটে আসেন সে দৃশ্য উপভোগ করতে।

জল নিয়ে এসে পাত্রের বাড়িতে চলে আরেক দফা নাচ। এখানেও অংশ নেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী লক্ষীদেবী, ময়না, কনিকা, পল্লবী, তনু ও শ্যমলসহ অন্যান্য শিল্পীরা। রসিক মনীন্দ্র দাদু মন উজার করে উপভোগ করেন। এক পর্যায়ে পাত্রের স্নান শেষ হয়। তাঁকে পড়ানো হয় ধুতি-পাঞ্জাবি। শুরু হয় স্থানীয় অতিথীদের ভোজ। আর ভোজশেষে ধান-দুর্বার মাধ্যমে মুরুব্বীরা পাত্রকে আশীর্বাদ করেন। পাত্রের মা কোলে বসিয়ে পাত্রকে দুধ খাইয়ে দেন। কারো কারো চোখে তখন জল চলে আসে। যেন মায়ের বুকটা ফেটে যায়! মায়ের ধন এই প্রথম যেন নাড়ি কেটে চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে! আগামী একেবারেই অজানা। তবুও এগিয়ে চলে বরযাত্রী। সাথে পাত্রের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্তদের একজন শ্যামল সরকার (বর্তমান পদবী কুলধারা)।

গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাটতে হাটতে আর ধনে, সজে, পেয়াজ, রসুনের ঘ্রান নিয়ে চলতে থাকে বরের দল। সাথে বিশেষ পোশাকে সজ্জিত বাদ্যদল। মাঝে মাঝেই রাস্তার মোড়ে লেকের ভিড়। পাত্রকে মোটক পড়া দেখবে। কুলধারা শ্যামল সরকার পাত্রকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। পাত্র একটু একটু লজ্জা পেলেও বেশি বেশি মজা পাচ্ছে। পরবর্তীতে গাড়িতে উঠেন সবাই। রাত নয়টার একটু আগে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর সদরের সেই তরফদার বাড়ির আঙ্গিনায় গমন। গাড়ি থামে। হাজার দর্শক। এক পলক পাত্রকে দেখবেন। পাত্র তখন ভিআইপি। কুলধারা শিরোমনি ক্ষিতীশদা, কুলধারা আবির ও একই দায়িত্বে থাকা আমার নিরাপত্তা বলয়ে রেখে পাত্রকে নিয়ে আমরা গাড়ি থেকে নামি।

শুরু হয় পাত্রী পক্ষের ডজন খানেক সুন্দরীর আক্রমন। তাঁরা গেট আটকিয়ে রেখেছেন। আমাদের ঢুকতে দেবেন না। তাঁদের টাকা দিতে হবে। এ নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক। এক পর্যায়ে কুলধারা শ্যামল কুমার পকেট হতে বের করলেন পাত্রের করোনা নিগেটিভ সনদ এবং পাত্রীর কাছ থেকেও এটি চাইলেন। এবার কুপোকাত সুন্দরীর দল। তারা স্লোগান দিতে থাকেন ভূয়া সনদ, ভূয়া সনদ, মানি না মানি না…। সাথে চলে পার্টি স্পের তুফান। পাত্রী পক্ষের সখিদের প্রধান টার্গেট পাত্র ও তার বডিগার্ডরা। পাত্র পক্ষের যুবকরাও কম না। এরাও খেলা শুরু করে। এলাকাটি মেরু অঞ্চলের সাদা বরফে ঢেকে যায়। অবশেষে শরবত-মিষ্টি খেয়ে পাত্রসহ আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। পাত্রকে নিয়ে বসি রাজকীয় সোফায়। শত শত ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করছে। বেশ লাগছে তখন। পাত্রের পাশাপাশি তখন আমিও হিরো। এর পর বিয়ে শুরু।

বিয়ের পর পাত্র-পাত্রীর মধ্যরাত্রির বিশেষ ফটোসেশন শেষে শুতে শুতে প্রায় তিনটা। রাতে শোবার পালা। একই রুমে পাত্র-পাত্রী, পাত্রের বড় বোন ও আমার থাকার ব্যবস্থা। আমরা শুয়ে পড়েছি। কয়েক স্তরের মেকাপ ধুয়ে পাত্রি এলো। সে পাত্রের বোনকে জিজ্ঞাসা করল, আমি শোব কোথায়? লেপের নীচ থেকে আমার কানে এল পাত্রের পাশে শুতে। পাত্রী বলল, না! আমি অন্যঘরে শুই (লজ্জাবতী)! পাত্রীর বোনের কথা ….না, আজ এখানেই শুতে হয়। এক সময় ঘুমিয়ে যাই। হঠাৎ জেগে দেখি পাত্র-পাত্রী মেঝের বিছানার দু’প্রান্তে দু’জন দু’দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। যেন ভারত-চীনের যুদ্ধাবস্থা! তবে পাঠক, হতাশ হবেন না। অনুকুল পরিবেশে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে বলেই আমার বিশ্বাস। চূড়ান্ত পরিণতির দিকে খেয়াল রাখুন।

ভোর হল। এবার পাত্রীর ঠাকুমা, দিদিমা আর বৌদিদের খেলা শুরু। উনারা সদলবলে ভেতরে এলেন। বকশিস চান। জিজ্ঞাসা করি কিসের বকশিস? বলেন, বিছানা উঠানোর। মানে, পাত্র-পাত্রী যে বিছানায় রাত কাটিয়েছে সেই বিছানা উঠানোর সম্মানি। এ নিয়ে বেশ মজা হল। অবশেষে তাঁদের খুশি করে বিদায় করলাম। পাত্রীর দিদিমা এক্ষেত্রে বেশ সহযোগিতা করেছেন।

সকালের নাস্তা শেষে শুরু হল পাত্র-পাত্রী সহ অন্যান্যদের নিয়ে স্থানীয় মন্দিরে গমন। আমরা রাস্তা দিয়ে চলছি। বাদ্য বাজছে। রাস্তার লোকজন আমাদের দেখছে। জনপ্রিয় হুমায়ূন আহমেদের নাটকে এসব দৃশ্য দেখেছি। এবার ঘটছে বাস্তবে। মন্দির হতে বেড়িয়ে শুরু হলো পথনৃত্য। এবার নেতৃত্বে পাত্রীর ছোট বোন লাস্যময়ী, হাস্যময়ী, মায়াবী কণ্ঠী, স্মার্ট তিথী বেয়াইন।

পাত্রীর বোনদের, সখিদের সাথে যুক্ত হলেন পাত্রের বড় বোন সুম্মিতা মন্ডল ও শ্যামল সরকার সহ অন্যান্যরা। ভিডিও ধারণ তো চলছেই। সে রীতিমত ‘‘মির্জাপুরের সুন্দরী’’ ছবির শুটিং। পাত্র-পাত্রী সরাসরি অভিনয় করতে না পারলেও ওদের মন ও চোখ নাচছিল। অবশ্য পাত্র তার নায়িকাকে নিয়ে একবার একটু উদ্যোগও নিয়েছিল। পাত্রীর বাড়ির আঙ্গিনায় ফিরে আরেক দফা ও ঘরের ভেতরে ঢুকে শেষ দফা গননৃত্য হল। পাত্রীর সুন্দরী বোনের মায়াবী আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারলেন না শ্যামল কুমার। অবশ্য হিংসুক অনন্যা এ জন্য শ্যামল কুমারকে কয়েক দফা টিজ করেছে। এরপর পাত্রের স্নান শেষে শুরু হল দ্বিতীয় দিনের বিয়ে। সেখানেও পাত্র-পাত্রী পক্ষের যৌথ নাচানাচি। এ পর্বে পাত্র পক্ষের মনীন্দ্র দাদু, ক্ষিতীশদা ও গুনীসরস্বতী বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

বিয়ে শেষ। খাবার শেষ করতে করতে সন্ধ্যা। এবার বিদায়ের বেদনার সুর। ব্যান্ড পার্টি গেয়ে উঠল, আমার যাবার সময় হল দাও বিদায়….। চারদিকে নিমিষেই নেমে এলো নিরবতা। হঠাৎ কানে ভেসে এলে কান্নার শব্দ। দেখতে পেলাম কন্যার মা সহ স্বজনরা কাঁদছেন। আমি একটু দূরে দূরেই রইলাম। বাইরে যত কিছুই বলি না কেন আমার মনের খবর তো আমি জানি। দু’চোখ ভিজে গেল। ভাবতে লাগলাম, কিভাবে এতগুলো বছর কাটানোর পরে মেয়েরা চলে যায়। কিভাবে মা-বাবা একা হয়ে যান। বিদায় যে নিতেই হয়। সন্ধ্যার পরে বর-কনে সহ আমরা রওনা দিয়ে রাতে ফিরে এলাম মানিকগঞ্জে।

পাড়াগ্রাম পৌছাতে প্রায় নয়টা। সেখানে বধুবরণ সহ মধ্যরাত পর্যন্ত নাচানাচি। পরদিন বৌভাতের (জামাই ভাতও) আয়োজন। মানিকগঞ্জ শহরের আশা কমিউনিটি সেন্টারে সকাল হতেই বরপক্ষের লোকজনের আনাগোনা। এজন্য ক্ষিতীশদা, আবির ও তাপস আগের শেষ রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। এ কাজে রাত তিনটায় গ্রাম থেকে রওনা দিয়ে সেন্টারে পৌছেছিলেন হরি কাকা ও বিনয়। দুপুর হতে চলে খাওয়া-দাওয়া। পাশাপাশি পাত্রের বড় বোন সুম্মিতা মন্ডলের উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতে থাকে। সাংস্কৃতিক পর্বে গান গেয়ে শ্রোতাদের একক সঙ্গীতে মাতিয়ে রাখেন এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানী লিমিটেড, গোপালগঞ্জের ফ্যাক্টরী ম্যানেজার ফার্মাসিস্ট বীরেন্দ্র কুমার মন্ডল। জনপ্রিয় মঞ্চশিল্পী যুথিকার অপরূপ অঙ্গসজ্জা, একক গান ও ডুয়েট শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। সুকন্যা বিভা একক সঙ্গীতে শ্রেতাদের মোহিত করে। সুপ্রিয় সহ অন্যান্য শিল্পীদের গান ও নাচেও ছিল বিশেষ আকর্ষণ (সব শিল্পীর নাম মনে নেই। সেজন্য দুঃখিত)।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। জামাই সমিতির জেনারেল সেক্রেটারী ক্ষিতীশদা’র নেতৃত্বে সদস্য আবির সহ প্রেসিডেন্ট শ্যামল সরকার নবদম্পতিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। শ্যামল সরকারের সমাপনি বক্তব্যের মাধ্যমে তিন দিনের মিলন মেলা শেষ হয়। বিশ হাজার লোকের বাইশ বছরের টানা পরিশ্রমের ফলে নির্মাণ হয়েছিল আগ্রার যমুনার তীরের তাজমহল। আর পাঁচ শতাধিক মানুষের অংশ গ্রহণে ও সহযোগিতায় সম্পন্ন হল এ আনন্দ যজ্ঞ।

Facebook Comments
ভাগ