শান্তিনিকেতনের অলোক বসু ও জয়দেব ভদ্র : কিছু স্মৃতি কিছু কথা/ শ্যামল কুমার সরকার

শ্যামল কুমার সরকার

দিনগুলি সত্যিই সোনার খাঁচায় বন্দি থাকে না। দিন চলে যায় বয়ে যায় বহমান নদীর মতই। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলাম। দূরপাল্লার নৈশ কোচে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। গাড়ি চলছে। ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে দেখি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মহানগরী ছাড়িয়ে গেছি। শেষ রাত। কী আর করা! ড্রাইভারের পরামর্শে চলে যাই প্রায় দু’ঘন্টার দূরত্বে চাপাই নবাবগঞ্জে। সেখানে নেমেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে দে ছুট। বুকে ছটফটানি নিয়ে চলে আসি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল-মনোরম ক্যাম্পাসে।

আমি গ্রামের ছেলে। গ্রামের স্কুল হতেই এসএসসি পাস। আর মানিকগঞ্জ জেলা সদরের দেবেন্দ্র কলেজ হতে পাস উচ্চ মাধ্যমিক। তাই হঠাৎ কুয়োর ব্যাঙের সাগর দেখার উপক্রম। সত্যি বলতে কিছুটা ভয়-ই পেয়ে যাই। আর সে সময় আমি আজকের চেয়ে অন্তত হাজার গুন ভীতু ছিলাম। যাহোক, বাণিজ্য অনুষদ ভবনে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। এক বেঞ্চে দু’জন করে বসা। আমার পাসে বসেছিল উত্তর বঙ্গের এক মেয়ে। ভর্তি পরীক্ষার হলে বন্ধুত্ব ঠিক নয় জেনেও সে মেয়েটির আকুতিতে বেশ কিছু প্রশ্নোত্তর তাকে বলেছিলাম। কারণ, প্রশ্নপত্র দেখে আমার আত্মবিশ্বাস এতটাই হয়েছিল যে, আমার কাঙ্খিত বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবই পাবো। হলো-ও তাই। মেধা তালিকায় ইংলিশ অনার্সে ভর্তির সুযোগ পেলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলাম। সেই মেয়েটিও ভর্তি হয়েছিল অন্য বিভাগে। কথাও হয়েছিল। হলে কোনো জায়গা নেই। কাজেই মেস বাড়িতেই আশ্রয় নেওয়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৎকালীন রাজশাহী বিআইটি’র সংযোগস্থলের দক্ষিণ মোড়ের (কাজলা) শান্তি নিকেতন ছাত্রাবাসে বসবাস শুরু হলো।

ইতোমধ্যেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনেকেতনের কথা বহুবার শুনেছি। ভারতের সে নিকেতনে যেতে পাসপোর্ট ভিসা লাগে। কিন্তু আমার এ শান্তিনিকেতনে আসতে তেমন কিছুই লাগেনি। সে সময়টায় আমি পুরোপুরি গ্রামীণ (এমনকি এখনো)। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ।

দুই
শান্তিনিকেতনে পেয়ে যাই আমার দু’ব্যাচ সিনিয়র বড় ভাই বোটানি অনার্সের অলোক বসুকে। তিনি যশোরের মানুষ। খাজুরায় বাড়ি। আমি ততটা ধার্মিক ছিলাম না (আজও না)। দেখি অলোক দা (বড় ভাই ততক্ষনে অলোকদা) খাবার সময় কথা বলেন না। আবার তিনি মাছও খান না। সপ্তাহে দাদার একদিন মেসের বাজার করতে হয়। দাদা বোর্ডারদের রুচিমত মাছ-মাংস কেনেন। কিন্তু খান শুধু নিরামিষ। তা-ও একবার, দু’বার নয়। রীতিমতো বছরব্যাপী নিরামিষ ভোজন। আবার দেখি স্নান করতে দাদার অনেক সময় লাগে। শান্তিনিকেতনের বিশাল পুকুরেই অলোকদা স্নানান্তে গামছা পড়ে বিড় বিড় করে কীসব যেন বলতেন।
অলোকদার সেসব দৃশ্য আমি নিরালো দেখতে থাকি। ভীষণ কৌতুহল জাগে দাদাকে নিয়ে। দেখি দাদা স্নান শেষে রুমে এসেও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন খাবার আগে। এসব আমার কাছে রীতিমতো অলৌকিক মনে হয়। মনে হাজারো প্রশ্ন জাগতে থাকে। সে তরুন বয়সের অলোকদার বৈরাগ্য সাধন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এছাড়া রামায়ন-মহাভারত-ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি, ক্রিকেট খেলা নিয়ে অলোকদার বিশাল জ্ঞান দেখেও আমি চমকে যাই। ততদিনে দাদাও আমাকে ছোটভাই হিসেবে স্নেহ করতে শুরু করেছেন। অলোকদার তর্কা-তর্কি (গাওয়া ভাষায় কাইজ্যা/ঝগড়া) শুনে আমি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে যেতাম। হাতে ভাতের প্লেট আর পরনে গামছা বা চাদুর। এভাবে না খেয়ে ঘন্টাধিক সময় দাদাকে তার বিরোধী বক্তার সাথে বাকযুদ্ধ করতে দেখেছি। আর এ কাজে অলোকদার নিত্যসাথী ছিলেন শান্তিনিকেতনের আরেক বড় ভাই, সুদেব দা (সুদেব সাহা)।

সুদেবদা ছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের। তিনি গণিতে এমএসসি (প্রিলিমিনারি) করছিলেন। এ দু’ বড় ভাইয়ের মারমুখী দৃশ্য দেখে প্রথম প্রথম ভয় পেয়ে যেতাম। পরবর্তীতে আমি অনেকবার শান্তিরক্ষীর ভূমিকা পালন করেছি। এ কারণে দু’জনেই আমাকে মাঝে-মধ্যে তিরস্কার করেছেন। মেনে নিয়েছি। বড় ভাই বলে কথা ! অন্তত সে সময় পর্যন্ত বড় ভাইদের আলাদা স্ট্যাটাস ছিল! তবে ভালো লাগতো এ জন্যই যে, অলোকদার সাথে আমার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত: আমার সে সময়ের গোঁবেচারা ভাবের জন্যই অলোকদা আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন।

মেসে একটু ভালো আয়োজন হলেই দাদা আমাকে উনার রুমে ডাকতেন। আমি বুঝতে পারতাম দাদা কি বলবেন। ঠিক তাই। দাদা বলতেন, রাধুনী দিদিকে বলে দিয়েছি আজ আমার মাছের বাটি তোমার কাছে যাবে। দাদাকে ধন্যবাদ দিতাম। কিন্তু আমি অতটা খেতে পারতাম না। পরে অলোকদার অনুদানের মাছ/মাংসের কিছু অংশ আমি আবার একজনকে দিতাম। তবে সব সময় না। পরবর্তী পর্যায়ে সেই একজনই অলোকদার বাৎসরিক বরাদ্দকৃত মাছ-মাংস পরম তৃপ্তিতে ভক্ষণ করেছে। যে কথা সে আজও স্বীকার করে। এবং সে অলোকদার সাথে অসংখ্যবার তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তবে সেটি কখনোই সুদেব দা’র মতো ভয়ংকর রুপ নেয়নি।

তিন
এবার অলোকদার মাছ-মাংস খাওয়ার অন্যতম সে চরিত্র নিয়ে কিছু বলি। সে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোনাতন কাটী গ্রামের ভদ্র ছেলে জয়দেব কুমার ভদ্র। আমার ব্যাচমেট। ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ্যা বিভাগে অনার্স পড়ুয়া। শান্তিনিকেতনের ২০/২২ টি ক্যারেকটারের মধ্যে এ ক্যারেকটারটিও নানান কারণে আমার মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে। জয়দেব ভদ্রকে আমি প্রথম দেখি ইন ছাড়া ঢিলেঢালা ফুলহাতা লাল জামা গায়ে। ঢোলা প্যান্ট। পায়ে চামড়ার চটি। চুল অনেকটা অমিতাভ/ মিঠুন টাইপ। ছিমছিমে ছোকরা। গোঁফ নেই। রামায়ন-মহাভারত-বেদ বিষয়ে সে বয়সেই অগাধ পান্ডিত্য। এসব বিষয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বক বক করতে পারে। আমি জয়দেবের কথা তম্ময় হয়ে শুনতে থাকি। আবার ভালো ইংরেজিও জানে। আমরা দু’জনেই দ্রুত ব্যাচমেট হতে সহমর্মী বন্ধু হয়ে যাই। দু’জনের কাছে আসার অন্যতম একটি অনুঘটকও ছিল। আর তা হলো অলোকদা। আমাদের দু’জনেরই অলেকদার প্রতি ছিল দুর্বার আকর্ষণ। অলোকদা কি করে কি খায় কখন মন্ত্র জপে ইত্যাদি আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করতাম। এতে দু’জনেই বেশ পুলকিত বোধ করতাম। সত্যিই সে সব ছিল আমাদের আনন্দের অনাবিল উৎস। এছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনেও জয়দেবের সাথে আমার মিল ছিল। অলোকদাও ছিলেন একই পথের পথিক। জয়দেব ও আমি সে সময় খুব লাজুক ছিলাম। একেবারেই লজ্জাবতী লতার মতো। মেয়েদের দিকে তাঁকাতাম না। আমাদের গার্লফ্রেন্ড ছিল না। বিকেলে মেয়েদের আবাসিক হলের এলাকা পশ্চিমপাড়ার মেলায় যেতাম না। অলোকদার এসবের তো প্রশ্নই আসে না। সে কারণেও দাদা আমাদের পছন্দ করতেন। পরীক্ষার দু’চার দিন আগ ছাড়া জয়দেবকে পাঠ্যবই প্রায় পড়তেই দেখিনি। তবুও প্রথম বর্ষ অনার্স ফাইনালে সে একশত পঞ্চাশ নম্বরের মধ্যে একশত সাতচল্লিশ (প্রাপ্ত নম্বর স্মৃতি হতে লেখা। ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী) পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো।

জয়দেবের বিরাট ক্ষমতা ছিলো কোনো পয়েন্ট ছুড়ে মারার। এর পরই শুরু হতো শান্তিনিকেতনে সাময়িক অশান্তির আনন্দময় খেলা মানে তর্কযুদ্ধ। আবার সেখানে কার্ড (তাস) খেলাও চলত ঘন্টার পর ঘন্টা। জয়দেব সে কাজে খুবই দক্ষ ছিল। কিন্তু কাজটি মোটেও পারতেন না অলোকদা, পারতাম না আমি। মেসবাসী অনেক চেষ্টা করেও আমাকে কার্ড খেলা শেখাতে পারেননি (আজও পারিনা)। শান্তিনিকেতনের বিধান দা (তালা/সাতক্ষীরা), পরিমল দা (যশোর/খুলনা), নীলকমলদা (তালা, খুলনা) ও সজল ভৌমিক (ভাংগা, ফরিদপুর) অন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চরিত্র। আমার ব্যাচমেট ও জয়দেবের ক্লাসমেট সজল-কে জয়দেব বড়ভাই বলে ডাকতো। বিধানদার সহজ-সরল জীবন আর আদরের ‘ভাইডি’ ডাক, পরিমলদার সাগরের মতো বিশাল বিশাল গল্প, আইনের ছাত্র নীলকমলদা’র সিরিয়াস পড়ালেখা ও চালচলন, নাদুস-নুদুস ও ফ্যাশন সচেতন ফিটফাট যুবক সজল ভৌমিক ও পাশের বাসার সরস্বতী মাসীর (দাদুর নাতনী) কথা মনে আছে এখনো। মনে আছে মেস মালিক সুধীর সরকার (ওরফে সুধীর খলিফা) ও তার স্থায়ী বন্ধু বৈষ্ণবী দিদিমার রুটিন মাফিক রোমান্টিক ঝগড়া এবং রাধুনী দিদির কথাও (১৯৭১ এ স্বামী হারানো)। ২০১৬ সালে সেখানে গিয়ে প্রাণের সেই শান্তিনিকেতনের কোনো অস্তিত্ব পাইনি। কোনো চিহৃ নেই ! বিশাল রাজপথের নিচে সব বিলীন হয়ে গেছে। কিছুটা সময় সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছি। যেখানে কাটিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের উত্তাল প্রথম দুটি বছর।

চার
শত কিছুর পরেও অলোকদা আর জয়দেব ছাড়া আমার কাছে শান্তিনিকেতন ছাত্রাবাস আজো প্রাণহীন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে অলোকদা আর জয়দেবকে হারিয়েছিলাম। তন্ন তন্ন করে দু’জনকে খুঁজেছি। স্মরণে থাকা বসু ডেন্টাল হল, দড়াটানা রোড, যশোরের ঠিকানায় অলোকদার কাছে একাধিক পত্র পাঠিয়েছি। পত্র পাঠিয়েছি মানিকগঞ্জে নানা কাজে আসা ভ্রাম্যমান লোকদের মাধ্যমেও। কোনো সাড়া পাইনি। অবশেষে নাটকীয় ভাবে দু’জনকেই ফিরে পেয়েছি। চলে গেছে অনেকটা সময়। প্রায় দু’যুগ। দু’জনই এখন দায়িত্বশীল পদে। অলোকদা কলেজে বোটানির সহযোগী অধ্যাপক আর জয়দেব বিপিএম পদকধারী পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি। ১৯৯০ সালে নিজ গ্রামে সমমনা বন্ধুদের নিয়ে জয়দেবের নেতৃত্বে গড়া অনির্বাণ লাইব্রেরি আজ বিশ্বখ্যাত। যার সদস্য সংখ্যা আট হাজার একশত। আমি নিজেও একজন নিস্ক্রিয় সদস্য। দু’জনেই দু’সন্তানের বাবা। যদিও জয়দেব আর আমার ধারনা ছিল অলোকদার বৈরাগ্য বেশ এ জীবনে যাবে না। সহকারী অধ্যাপক থাকাবস্থায় দাদার বিয়ের কথা শুনে আমরা বিশ্বাসই করতে চাইনি। সবই ঠাকুরের ইচ্ছে। তাইতো তিনি মুন্সিগঞ্জের একজন সাধ্বী রমনীকে অলোকদার বউ করে দিয়েছেন। তিনিও নিরামিষ ভোজী। আমাদের অলোকদার অপেক্ষাতেই ছিলেন! বৌদিকে দেখতে জয়দেব সেই মুন্সিগঞ্জে ছুটে গেছে তার বাবার বাড়িতে। আমার সে ভাগ্য এখনো হয়নি। তবে মোবাইলে একাধিকবার বৌদির মায়াবি কণ্ঠ শুনেছি। করোনার কিছুদিন আগে অলোকদাকে মোবাইল করে জানলাম তিনি বউ-বাচ্চাদের নিয়ে বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের সামনে। বেড়াতে গিয়েছেন। আমি বললাম, দাদা-এটি কি বৌদির জবরদস্তি? অলোকদা হেসে বললেন ‘‘সবই মায়ার খেলা’’। আমিও হেসে দিলাম। পরে জয়দেবকে বিষয়টি জানালে সে-ও হাসলো!

শ্যামল কুমার সরকারঃ সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ঝিটকা খাজা রহমত আলী কলেজ, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ।

Facebook Comments
ভাগ