অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর : ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পথিকৃত/ রুহুল ইসলাম টিপু

অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর : ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পথিকৃত

রুহুল ইসলাম টিপু

ঘুরে এলো নিলুফার মঞ্জুর এর পরলোকগমনের এক বছর। ২৬ মে ২০২০ এ নিলুফার মঞ্জুর ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর। নিলুফার মঞ্জুর বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সানবিমস এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। নিলুফার মঞ্জুর এর পিতা ড. মফিজ আলী চৌধুরী ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালের কেবিনেটের একজন মন্ত্রী। সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার সরলীকরণ উপস্থাপনায় দেখা যায়; আমাদের রয়েছে: সাধারণ শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা। অন্যদিকে রয়েছে প্রোফেশনাল শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা, মেডিক্যাল শিক্ষা। আরও রয়েছে বিশেষায়িত শিক্ষা, মাদরাসা শিক্ষা, মূলধারার মহিলাদের জন্য শিক্ষা, আইসিটি শিক্ষা, দূরশিক্ষা পদ্ধতি এবং লাইব্রেরি ও তথ্যবিজ্ঞান শিক্ষা। এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এর সাথে রয়েছে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা যেটি ব্রিটিশ কারিকুলাম এ বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ‘ও’ লেবেল (গ্রেড-১০) এবং ‘এ’ লেবেল (গ্রেড-১২)। আমাদের দেশের বিত্তবান অর্থশালী ব্যক্তিবর্গ তাদের সন্তানদের প্রতিবেশি ভারতে পাঠিয়ে ‘ও’ লেবেল এবং ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করাতেন এবং এখনও করিয়ে থাকেন। কেউ কেউ এখনও আরো উন্নত দেশে সন্তানদের শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এটি সক্ষমতা এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। তবে একথা সর্বজনবিদিত যে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে ইংরেজি বিকাশ-প্রকাশ জানা, পারদর্শি মানুষের সংখ্যা সে অর্থের বিচারে আশানুরূপ নয়। জ্ঞান বিজ্ঞানের উচ্চতর বই পুস্তক, শিক্ষা আয়ত্ত্বের মাধ্যম এখনো ইংরেজি। বিশ্বমন্ডলে আমাদের সাফল্যের কাতার বৃদ্ধিতে ইংরেজি’কে আরো বেশি আলিঙ্গন করে শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞরা এ মতই প্রকাশ করেন।

আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের দেশে দূরদর্শী সম্পন্ন একজন শিক্ষাবিদ নিলুফার মঞ্জুরকে পেয়েছিলাম। তিনি ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি সানবিমস ইংরেজি মাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সানবিমস গড়ে উঠে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাকে কেন্দ্র করে; ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়। ছাত্র-ছাত্রীরা গড়ে উঠবে বাংলাদেশি আদর্শে, শিক্ষা হবে বাংলা সংস্কৃতির আবহে, সনদ প্রাপ্তির সাথে তারা হবে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। দেশ এবং জাতি গঠনে রাখবে মহান অবদান। অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিবিষ্ট করলেন জ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষার চর্চা। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলোতে আরও যেসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুল রয়েছে; তাদের সাথে সানবিমস এর মৌলিক পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য দ্বারা আজ প্রমাণিত যে, অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর এক মহিয়সী কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পথিকৃত। তিনি শিক্ষাদানের পাশাপাশি স্যোশাল মার্কেটিং কোম্পানী (এসএমসি) এর সাবেক পরিচালক ছিলেন। নিলুফার মঞ্জুর এর স্বামী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ছিলেন দুইবার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাকালীন বোর্ড অব ট্রাস্ট্রির চেয়ারম্যান ছিলেন।

নিলুফার মঞ্জুর’কে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ মিডিয়া থেকে জানা যায়, তাঁর ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ দেশে বিদেশে অসামান্য সাফল্যমন্ডিত। তাঁদের একজন নাহিদ ইজাহার খান। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-৫ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাঁর পিতা শহীদ কর্ণেল খন্দকার নাজমুল হুদা বীর বিক্রম। নাহিদ ইজাহার খান এমপি হওয়ার জন্য নিলুফার মঞ্জুর এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নিলুফার মঞ্জুর তাঁর ছাত্রী নাহিদ ইজাহার খানের স্কুল জীবনে অভিভাবকের ন্যায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নাহিদ ইজাহার খান জানান, ঢাকার স্কুলগুলো তাঁকে ভর্তি করতে চাননি। কারণ তিনি ছিলেন কর্ণেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম এর কন্যা। যিনি ১৯৭৫ সালের সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন। তখন তিনি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলেন। কিন্তু নিলুফার মঞ্জুর এর সানবিমস স্কুল তাঁকে লেখাপড়ার আশ্রয়টুকু দিয়েছিলেন। তিনি এ স্কুলে ভর্তি হয়ে মানসিক আঘাত উপশম করতে পেরেছিলেন। তিনি শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ২০ বছর এ স্কুলের গর্বিত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তিন সন্তান এ স্কুলের শিক্ষার্থী। নাহিদ ইজাহার খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় নিলুফার মঞ্জুর এর আশির্বাদ বার্তা ছিল, ছাত্রী তাঁকে আজ গৌরবান্বিত করেছে। সানবিমস্ এর শিক্ষক হিসেবে তাঁর (নিলুফার মঞ্জুর) স্বপ্ন পূরণ করেছে ছাত্রী। আজ দেশ সেবার মাধ্যমে বাবার (কর্ণেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম) স্বপ্ন পূরণ করবে একই ব্যক্তি তাঁর ছাত্রী, সংসদ সদস্য নাহিদ ইজাহার খান।

নিলুফার মঞ্জুর সম্পর্কে এরকম বহুবিধ ঘটনা তুলে ধরার মতো তথ্য আমার সংরক্ষণে। আমাদের দেশে নিলুফার মঞ্জুর এর ন্যায় মানুষের বড় প্রয়োজন। সানবিমস এর সফল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রথিতযশা ব্যক্তি। পর্দা কাঁপানো সারা জাকের, সুর্বণা মুস্তাফা, ইরেশ জাকের, মেহের আফরোজ শাওন, নাভিদ মাহবুব, এলিটা করিম, সাফায়েত মনসুর রানা এবং আরো অনেকে বিমার্স মানে সানবিমস এর প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

সানবিমস এ ভর্তিতে মেধাভিত্তিক নির্বাচন হচ্ছে অন্যতম নীতির একটি। নিলুফার মঞ্জুরকে নিয়ে কিছু লিখবো। এ প্রেরণাটি পেয়েছিলাম গত বছর ০২ জুন তারিখে প্রথম আলোয় প্রকাশিত চারু শিল্পী এবং সানবিমস স্কুলের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক সাঈদা কামাল এর লেখা দেখে। লেখার শিরোনাম ‘অনুকরণীয় নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন সবখানে।’ এর ভিতরের গল্প বাংলা সিনেমায় প্রচুর দেখেছি। অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর শিক্ষা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান সানবিমস্ এর জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন। সাঈদা কামাল এর লেখা হচ্ছে তাঁর জীবন্ত উদাহরণ। চেকে টাকার অঙ্ক না লিখে কাউকে চেক প্রদান। আমি সিনেমায় দেখেছি। গল্পে শুনেছি। বাস্তবে নয়।

পাঠককে এ অংশের পূর্ণ রূপ এবং ভাব দিতে সাঈদ কামাল এর লেখা হতে উদ্ধৃতি করছি, ‘একবার আমি স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে শান্তিনিকেতনে যাই এক বছরের একটা কোর্স করার জন্য। ফিরে এসে স্কুলে যোগ দেব কি না ভাবছি, নানা কারণে মনটা কিছুটা বিক্ষিপ্ত, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি, অবশেষে স্কুলে যোগ দিলাম। মাস শেষে নিলুফার আপা হাতে বেতনের চেক তুলে দিলেন। বাড়ি এসে খাম খুলে আমি তো থ। আপা তাঁর সই করা একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিয়েছেন, কোনো টাকার অঙ্ক লেখা ছাড়াই। সঙ্গে সঙ্গে আমি ফোন করে বললাম, আপা, আপনি ভুল করে আমাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়েছেন, কোন অঙ্ক লেখা হয়নি। আপা হেসে বললেন, ‘ভুল করে দিইনি, ইচ্ছে করেই দিয়েছি, তোমার যত দরকার তত লিখে নিয়ো। তুমি যে আবার আমার স্কুলে ফিরে এসেছ, আমি এতে খুশি।’ ইতোপূর্বে ব্ল্যাঙ্ক চেকের বাস্তব গল্পের অভিজ্ঞতা আমার ঘটেনি। এটি জানার পর থেকে অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর এর প্রতি আমার ভক্তি ও শ্রদ্ধা কয়েক লক্ষ গুণ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের শিক্ষা বিস্তার প্রসারে প্রয়োজন অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর এর ন্যায় আরও অনেক মহান শিক্ষাবিদের। শিক্ষা ছাড়া দেশের আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা অতীব দুরহ হয়ে উঠবে। তাই মানসম্পন্ন পরিপূর্ণ শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রয়াত নিলুফার মঞ্জুর সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, শিক্ষা গবেষক ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মানসম্পন্ন স্কুল শিক্ষার একজন পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রচলন। তাঁকে আমি বর্ণনা করবো একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষা উদ্যোক্তা হিসেবে যিনি মূল্যবোধকে কখনই জলাঞ্জলি দেননি।’ তিনি আরও জানান, তাঁর তিন সন্তানের সবারই প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছে সানবিমসে। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সানবিমসে পঞ্চম স্তর পর্যন্ত পাঠদান করা হতো। বর্তমানে আইএ স্তর (International Advanced Level) পর্যন্ত পরিচালনা করে। রাশেদা কে. চৌধুরী আরো বলেন,‘সুতরাং একজন অভিভাবক হিসেবেও আমি দিনের পর দিন দেখেছি কিভাবে নিলুফার বাচ্চাদের গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল হলেও তিনি সবসময় চেয়েছেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা যেন দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি না ভোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তিনি কখনো ভোলেননি।’

অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পথিকৃত। আজ ২৬ মে ২০২১ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জ্ঞাপন করছি আমাদের সশ্রদ্ধ ও বিনম্র ভালোবাসা। প্রতিটি দিনের শুরু নতুন আনন্দ এবং প্রতিজ্ঞার মধ্য দিয়ে। আমরা বৃষ্টির পরিবর্তে রংধনু দেখতে চাই। এটি অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর এর কথা। সানবিমস এর ওয়েবসাইট থেকে গ্রহণ। ভাষান্তর করা হয়েছে। অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর লোকান্তরিত হয়েছেন। তিনিই আমাদের রংধনু। তাঁর শিখানো শপথ প্রতি দিনের নতুন আনন্দ এবং প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে শিক্ষা, সাফল্য, গৌরবগাথা আবিস্কারের মধ্যদিয়ে রংধনুকে রাঙাতে চাই। রাঙা হোক আমাদের দেশ। সফল বাংলাদেশ।

কড়চা/ আর আই টি

Facebook Comments
ভাগ