জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা/ রুহুল ইসলাম টিপু

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা

রুহুল ইসলাম টিপু

১৭ মার্চ ২০২১ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১ তম জন্মদিন। একই সময় বাংলাদেশ উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। ১৭ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ‘মুজিব চিরন্তন’। বঙ্গবন্ধুর জীবনের ব্যাপ্তি মহাসমুদ্রের মতো। আমার হাতে শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’; সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক ‘কালি ও কলম’ এর মাঘ ১৪২৬ সংখ্যা। এ দুটি বই এবং সাহিত্য পত্রিকায় সংকলিত বঙ্গবন্ধু ভাষণের উক্তিসমূহ গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং শিক্ষা গ্রহণ আজ আমাদের বড় প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার বড় জায়গা মানুষ এবং দেশ। তিনি বিশ্বনেতা। আমাদের গৌরব। কালি ও কলম এর মাঘ ১৪২৬ সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুর ৭ টি পূর্ণ ভাষণ রয়েছে; সেগুলো হচ্ছে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনোত্তর ভাষণ ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২, রেসকোর্স মাঠ, ঢাকা; প্রথম স্বাধীনতা দিবসে ভাষণ ২৬ মার্চ, ১৯৭২, ঢাকা; সমবায়ের ওপর ভাষণ, ৫ এপ্রিল, ১৯৭২, বাংলাদেশ বেতার; জুলিও কুরি শান্তিপদক পেয়ে ভাষণ, ২০ নভেম্বর ১৯৭২ আওয়ামী লীগ-আয়োজিত সংবর্ধনা সভা; বুদ্ধিজীবীদের এক সভায় ভাষণ, ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭২, চট্টগাম; প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪, ঢাকা এবং কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ভাষণ, ৪ ডিসেম্বর, ১৯৭৪, ঢাকা।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনোত্তর ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমার বাংলা স্বাধীন থাকবে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যারা সংগ্রাম করেছে, আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম, ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে কেউ দাবায় রাখতে পারবে না। আমার বাংলার মানুষ স্বাধীন হবেই। আমি আমার সেই যে ভায়েরা যারা আত্মাহুতি দিয়েছে, শহিদ হয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’

‘আজ আমার মনে হয়েছে, প্রায় ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দেয়া হয়েছে এই বাংলায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও এবং প্রথম মহাযুদ্ধেও এতো লোক, এতো সাধারণ নাগরিক মৃত্যুবরণ করে নাই, শহিদ হয় নাই। যা আমার এই সাত কোটির বাংলাদেশে হয়েছে। আমি জানতাম না, আপনাদের কাছে আমি ফিরে আসবো। তাই আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম। তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও আমার আপত্তি নাই। মৃত্যুর পরে আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিও। এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে রাখলাম।’

‘আমার বলতে হয় এক কোটি লোক এই বাংলাদেশের থেকে ঘর-বাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের জনসাধারণ মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাদের খাবার দিয়েছে। তাদেরকে মোবারকবাদ জানাতে পারি নাই। যারা, অন্যরা, সাহায্য করেছে, তাদেরকেও মোবারকবাদ দিতে হয়।’

‘আমার বহু ভাই, আমার বহু কর্মী, আমার বহু মা বোন, আজ দুনিয়ায় নাই। তাদের আমি দেখবো না। আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়া অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় বড় ভালবাসি। খোদা তার জন্যই আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে।’

‘আমার বাঙালি দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে, দুনিয়ার ইতিহাসে স্বাধীনতার সংগ্রামে এতো লোক আত্মহুতি, এতো লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি, আমায় দাবায়ে রাখতে পারবা না। আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম, ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে, তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’

‘বাংলায় যে লোকেরা আছে, অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক, বাংলায় কথা বলে না। আজও বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমরা আমার ভাইদের বলছি, তাদের ওপর হাত তুলো না। আমরা মানুষ,

‘কত বড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ মানুষকে এভাবে হত্যা করে সামরিক বাহিনীর লোকেরা। আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী। ঘৃণা করা উচিত, তাদের জানা উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে এই বাংলাদেশই দ্বিতীয় স্থান মুসলিম কান্ট্রি। আর ইন্ডিয়া তৃতীয় স্থান, আর পশ্চিম পাকিস্তান চতুর্থ স্থান। আমরা মুসলমান! আমার রাষ্ট্রে এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।’

‘ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পশ্চিম পাকিস্তানে। আমি তাদের অনুরোধ করবো, তাদের একটা জিনিস আমি বলতে চাই, তোমাদের অ্যাপ্রুভাল নিয়ে আমার সহকর্মীরা, ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে, অথবা ওয়ার্ল্ড জুরিসডিকশনের পক্ষ থেকে একটি ইনকোয়ারি হতে হবে, যে কী পাশবিক অত্যাচার, কীভাবে হত্যা করেছে আমাদের লোকদের, এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানাতে হবে। আমি দাবি করবো জাতিসংঘকে, হিউম্যান রাইটসকে, বাংলাদেশকে আসন দাও এবং একটি ইনকোয়ারি করো।’

প্রত্যাবর্তনোত্তর বক্তব্যের শেষ প্রান্তে তিনি বলেন, ‘ইনশাল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি, স্বাধীন থাকবো। একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে কেউ আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবে না।’

২৬ মার্চ, ১৯৭২, ঢাকা: প্রথম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার প্রিয় দেশবাসী, বিগত ২৫ বৎসর ধরে আপনারা ক্ষুধা, যন্ত্রনা, অশিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরতন্ত্র, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সা¤্রাজ্যবাদী শোষকরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে একটা নিষ্ঠুরতম উপনিবেশে পরিণত করেছিল। দুঃসহ ও ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। পিষ্ট হয়েছিল শোষণের জগদ্দল পাথরের নিচে চাপা পড়ে। দারিদ্র্যের ও অনাহারের বিষবাষ্পে যখন আমরা আকন্ঠ নিমজ্জিত, তখন তদানীন্তন পাকিস্তান শোষকরা আমাদের কষ্টার্জিত ৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তোলার কাজে মত্ত ছিল। ন্যায়বিচার, মৃত্যুর হিমশীতল কষ্ট আমাদের ওপর নেমে এসেছিল। সমসাময়িক কালের নিষ্ঠুরতম স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে। আজ তিন কোটি মানুষ হয়েছে সর্বস্বান্ত। এ সবকিছুই ঘটেছে আমাদের স্বাধীনতার জন্য। আজ আমি যখন সোনার বাংলার দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর পান্ডুর জমিন। ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রাম, ক্ষুধার্ত শিশু, বিবস্ত্র নারী আর হতাশাগ্রস্ত পুরুষ। আমি শুনতে পাই সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ। নির্যাতিতা নারীর ক্রন্দন, পুঙ্গ মুক্তিযোদ্ধার ফরিয়াদ। আমাদের স্বাধীনতা যদি তাদেরকে আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ধার করে এদের মূখে হাসি ফোটাতে না পারে, লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে তুলে দিতে না পারে এক মুঠো অন্ন, মুছে দিতে না পারে মায়ের অশ্রু ও বোনের বেদনা, তাহলে সেই স্বাধীনতা বৃথা, সে আত্মত্যাগ বৃথা। আমাদের এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা বর্ষপূর্তি উৎসবের লগ্নে দাঁড়িয়ে আসুন আজ আমরা এই শপথ গ্রহণ করি, বিধ্বস্ত মুক্ত বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। গুটিকয়েক সুবিধাবাদী নয়, সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার ফসল ভোগ করবে।’

এখন আমরা প্রায় ১৭ কোটি। জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। হে মহান জাতির পিতা, আপনার আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা মানুষ এবং দেশকে ভালোবাসবো; আপনার মহান জন্মদিন এবং আমাদের স্বাধীনতার সুর্বর্ণজয়ন্তীতে এটি আমাদের অঙ্গীকার। ১০১তম শুভ জন্মদিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জ্ঞাপন করছি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

Facebook Comments
ভাগ