দৌলতপুরে একদিন/ রুহুল ইসলাম টিপু

লেখক রুহুল ইসলাম টিপু

দৌলতপুরে একদিন

রুহুল ইসলাম টিপু

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। সময় ১৯৮৫ সাল। ছোট শহর। মহকুমা থেকে জেলায় রূপ পেয়েছে এক বছর হলো। কাজ করি ছোটদের পড়ানো। মানে টিউশনি। চলার মতো টাকা পাওয়া যায়। এ চর্চা আমার ’৮৩ সাল হতে। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই শুরু করি। পকেট খরচ চলে। বাবা’র নিকট হাত পাততে হয় না। মজা পাই। টাকার উপার্জন আত্মবিশ^াসকে মজবুতি করে। আনন্দ সেথায় যেসব ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশুনায় বেশি মনযোগী। এরকম শিক্ষার্থীই আমার পছন্দের। বিদ্যালয়েও তাদের অসাধারণ সাফল্য। পেশাগত এবং কর্ম জীবনে তাঁরা আজ অনেক সুউচ্চে অবস্থান করছে। আমি তাঁদের পাঠদানের সহায়তায় ছিলাম। এতে ভীষণ পুলক অনুভব করি। আমার টিউশনি বেউথা রোডে তিনটি। রিজার্ভ ট্যাঙ্কের নিকট একটি। একজন পড়াই শহরের মাঝখানে ঔষধের দোকানের পিছনে। এটি আমার ছাত্রের মামা’র দোকান। মামা তাঁর ভাগ্নেকে বড় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমার এ ছাত্র শুধু সফল তা নয়। অতীব মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে আজ সমাসীন। ছাত্র-ছাত্রীদের ঈদ পূজা পার্বণে আমি বেশ আহ্লাদি হয়ে উঠি। দাওয়াত এবং নেমন্তনে আমার কমতি থাকে না। আনন্দের সাথে সামিল হতেও আমার চেষ্টার ঘাটতি ঘটে না। মানিকগঞ্জ শহরে এই হচ্ছে আমার আনাগুনার পথ। নিয়মমাফিক বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি সময় কাটে মানিকগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরিতে। বই ফেরত এবং গ্রহণ পর্ব। বেশ কিছুক্ষণ ধরে সংবাদপত্র পড়া। লাইব্রেরির নিরিবিলি পরিবেশ। পাশেই কোর্ট মসজিদ। লাগোয়া হাসপাতাল। এ সময় পর্যন্ত এখানেই ছিল। এর পরপরই সদর হাসপাতাল চলে আসে বাস স্ট্যান্ডে। লাইব্রেরির পশ্চিম দিকে স্টেডিয়াম সংলগ্ন পুকুর। পড়ন্ত বিকেলের রৌদ্র পুকুরের পানির উপর পড়ে প্রতিবিম্ব হতো লাইব্রেরির পশ্চিম দিকের কাচের জানালায়। রোদের আঁচ পড়ার টেবিলেও আছড়ে পড়তো। স্টেডিয়ামে থাকত নিয়মিত ফুটবল খেলা। সেটিও বাদ পড়তো না।

বাবা’র প্রিয় জায়গা মানিকগঞ্জ শহর। সরকারি চাকুরিতে বদলির নোটিশ আসামাত্র তিনি সেটি মানতে পারতেন না। খুব অসহায় বোধ করতেন। জমির সামান্য ফসলে চাকুরিচ্যুতিতে সংসার সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। এই ভয়ে তিনি আমাদের তিন ভাইয়ের পড়াশুনার বিষয় বিবেচনা করে ছুটে যান বদলিস্থল নতুন উপজেলা দৌলতপুরে। সপ্তাহান্তে বাড়িতে আসেন। মানিকগঞ্জ শহর হতে দৌলতপুর যাতায়াত এখনকার মতো তখন সহজ ছিল না। বাবার জন্য কষ্ট পেতাম। তিনিও কষ্ট করে অফিস করতেন। তিন ভাই এবং মা’কে নিয়ে আমরা বেউথা’র বাড়িতে থাকি। বাবা ছাড়া সপ্তাহের বড় সময় বাড়ি ফাঁকা। মূখ্য ব্যক্তিই বাড়িতে নেই। বাড়িতে ভালো খাবারের রান্না হতো বন্ধের দিনগুলিতে। মা’কে বিভিন্ন খাবারের জন্য পীড়াপীড়ি করি। মা বলতেন এ তো দু’দিন পর তোদের বাবা আসবেন তখন সেসব হবে। এভাবেই ঘুরে আসতেন বাবা। বাড়িতে আনন্দের ঢেউ থাকতো বন্ধের দিনগুলিতে। অফিস-দিন বাবা খুব ভোর বেলায় বাড়ি থেকে বের হতেন। দৌলতপুর অনেক দূর। তিনি কতভাবেই না যানবাহন অতিক্রম করে দৌলতপুরে নিয়মিত পৌছান।

এমনি একদিন। দিবসটি ছিল সোমবার। বাবা আগের দিন দৌলতপুর চলে গিয়েছেন। বাস স্ট্যান্ডে বিকেল বেলা বাজার বসে। লাইব্রেরি হতে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই বাস স্ট্যান্ড। বাজারে উঁকি দিয়েছি। সেখানে পাঙ্গাস মাছের ভাগ দেওয়া হয়েছে। পকেটে কিছু টাকাও ছিল। এক ভাগ পাঙ্গাস মাছ কিনি। এ পাঙ্গাস এখনকার পুকুরের মাছ নয়। আরিচার যমুনা বা পদ্মা নদীর পাঙ্গাস। নিয়ে আসি বাড়িতে। মা বললেন, পাঙ্গাস মাছ এনেছিস। আজ তোদের বাবা বাড়িতে নেই। তাঁকে ছাড়া এ মাছ খাবো? তখন তো বাসায় ফ্রিজ ছিল না। রান্না হতো লাকড়ির চুলায়। আমি বোধহয় ভুল করেছি মাছ কিনে। এক রকম কষ্ট অনুভব করি। সপ্তাহান্তে টাকা ব্যয় করে এরকম মাছ আবার কিনতে পারবো। সে সামর্থও আমাদের নেই। খুবই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। সাহস করে বলি, মা মাছগুলো এখন হলুদ দিয়ে রাখুন। সকালে আজানের আগেই রান্না করবেন। আমি খুব সকালে বাবা’র জন্য নিয়ে যাবো। মা আমাকে কখনও কষ্টের কাজ দেন না। দৌলতপুর যেতে কষ্ট হবে সেটি মা জানেন। তারপরও বাবা খাবেন। তাই মা আমাকে জোড় করে বারণও করলেন না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি।

ফজরের আজানের পূর্বেই মা’র পাঙ্গাস মাছ এবং ভাত রান্না শেষ। টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে দিলেন। আমার যাত্রা শুরু হলো। রিক্সায় বেউথা হতে বাস স্ট্যান্ড। উঠি আরিচাগামী মুড়িরটিন বাসে। এখন এরকম বাস চোখে পড়বে না। লোকাল বাস। সকল স্টেশনে থামাবে। যেমন মুলজান, তরা, বানিয়াজুড়ি, জোকা, মহাদেবপুর, এরপর বরঙ্গাইল। নেমে পড়ি বরঙ্গাইল বাস স্ট্যান্ডে। এখান হতে ঘোড়ার গাড়িতে ঘিওর। রাস্তা ভালো না। গাড়ি নড়ে চড়ে। পড়ি তো উঠি। উঠি তো পড়ি অবস্থা। ধূলাবালি একাকার। আমার টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ধরা। এটি নষ্ট করা যাবে না। আমার দেহের অবস্থা যতই নাজুক হোক। তাতে যায় আসে না। সাড়ে দশটা এগারোটায় পৌছি ঘিওর হাটে। এরপর কোন যানবাহন নেই। হাঁটতে হবে। পথ চিনি না। শুধু মানুষ দেখলেই জিজ্ঞেস করি। দৌলতপুর যাবো। রাস্তা কোনটি। চক বরাবর পথ। চক মানে ক্ষেতের আল। ঐ গ্রাম দেখছেন। এরপর সোজা রাস্তা। সে গ্রামের পর আরেক চক। চকের মাঝ বরাবর হেঁটে পাবেন আরেক গ্রাম। তারপর চক। এভাবেই হাঁটতে থাকি। হাঁটা আর শেষ হয় না। ইতোপূর্বে কখনও এতো বেশি হাঁটি নি। চিনিও না। শুধু মানুষের মুখের কথার উপর ভরসা। সাথে খাবার। বাবা’কে পাঙ্গাস মাছ খাওয়াবো। এ ব্রত আমি গ্রহণ করেছি। পালন না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই। আমি চলছি। ক্ষুধায় খুবই ক্লান্ত। হাতেই আমার খাবার। ভাত এবং মাছ সবই আছে। এ খাবার তো খাওয়া যাবে না। বাবা খাবেন। চক অতিক্রমের পর গ্রামে ঢুকেই টিউবওয়েল হতে দুই হাত জোড় করে পানি পান করি। ক্লান্তি কিছুটা দূর হলেও দূরত্ব বিবেচনায় পেয়ে যাই ভয়। আরো হাঁটা। আবার হাঁটা। এতো দূরের পথ। ভাবি আমি তো একদিন যাচ্ছি। বাবা প্রতি সপ্তাহে দুইবার যাতায়াত করেন। তিনি তো আমাদের জন্যই এ বিশাল কষ্টকে হাসিমুখে মেনে চলেন। এ ভাবনায় বেশ শক্তি অনুভব করি। হাঁটতে থাকি। ক্লান্তিতে হাঁটার গতি আর বাড়ে না। আস্তে আস্তে পৌঁছে যাই গন্তব্যে। দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ। পরিষদের নতুন নতুন ভবন নির্মাণ চলছে। সরকারি কোয়াটার ডরমেটরি কোনটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও রাস্তার কাজ চলছে। বুঝাই যাচ্ছে থানা সেজে উঠছে উপজেলার রূপে। একজনকে জিজ্ঞেস করি। কৃষি অফিস কোনটি। তিনি যতœ করে দেখালেন। বুঝলেন ছোট ছেলে হয়ত কিছুই চিনে না জানে না। তাই আন্তরিকভাবে দেখিয়ে দিলেন। দেড়টার উপর সময়। বাবা হেড ক্লার্ক। তাঁর রুমে চার পাঁচটি টেবিল। তাঁর টেবিল দরজামূখী মাঝামাঝি। একটু বড়ও বটে। রুমে এ সময় আর কেউ নেই। তিনি আমাকে দেখে অবাক। দৌড়ে টেবিলের ওপাশ হতে দরজার নিকট চলে আসেন। বলতে থাকেন, ‘তুমি এখানে? বাড়িতে কোন দুর্ঘটনা? গতকাল এলাম আমি? আজ তুমি? মা তোমাকে পাঠিয়েছে? কেন?’ অনেক অনেক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন বাবা। আমি কিছুই বলতে পারি নি। ডান হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। বাবার হাতে দিলাম। ‘এটা কি?’ বাবা বললেন।

আমি বললাম, ‘মা দিয়েছেন।’ বাবা হতবাক। খুলে দেখেন পাঙ্গাস মাছ আর ভাত। তাঁর বুঝতে কিছু বাকী রইল না। শুধু বুকে জড়িয়ে ধরলেন। নিয়ে গেলেন ডরমেটরীতে। যেখানে তিনি থাকেন। গোসল করালেন। আমাকে খাওয়ালেন এবং নিজে খেলেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছেন। ঘিওর থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত আসা। শুধুই হেঁটে। এ কষ্ট তিনি কিছুতেই মানতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর উর্ধতন কর্মকর্তা কৃষি অফিসারের নিকট। আমি এখন বুঝি। একজন ক্লার্ক তাঁর অফিসারের নিকট ব্যক্তিগত কাজের জন্য গাড়ির আবেদন করছেন। সেটি ছিল একটি বিশাল কঠিন কাজ। আস্পর্ধাও বটে। আমার কষ্ট অনুমান করে বাবা সে সময় পাগলপ্রায় হয়ে গেলেন। সম্ভবত: এসময় উপজেলায় শুধুমাত্র ইউএনও’র জন্য একটিমাত্র গাড়ি ছিল। তাও সেটি সব সময়ের জন্য নয়। বাবা এসব জেনেই তাঁর স্যারের নিকট অনুরোধ করেন। বলেন, স্যার আগামীকাল গাড়ি উপজেলা হতে মানিকগঞ্জ জেলা শহরে যাবে কি-না। আমার ছেলে পাঙ্গাস মাছ আর ভাত নিয়ে এসেছে মানিকগঞ্জ হতে। ঘিওর হতে দৌলতপুর এসেছে পায়ে হেঁটে। যদি মানিকগঞ্জে গাড়ি না যায়, তবে ঘিওর পর্যন্ত একটা গাড়ির ব্যবস্থা করুন। আমাকে নিরাপদে বাড়ি পাঠানোর বাবার সে আকুতি কোনদিন ভুলবো না। কৃষি অফিসার ইউএনও’কে অনুরোধ করে গাড়িতে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত পরদিন আমাকে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

আজ বাবা নেই। তাই সবই স্মৃতি বিজড়িত। এটি ছিল আমার নতুন জেলার বাইরে প্রথম উপজেলা দর্শন। বাবার সাথে কাটলো সময়। দৌলতপুরে একদিন।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ