ফকির আলমগীর ও কিছু স্মৃতি/ মধূসুদন সাহা

ফকির আলমগীর ও কিছু স্মৃতি

মধূসুদন সাহা

নামে ফকির হলেও তিনি ছিলেন গণসংগীত ও বাংলা পপ সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট। অর্ধ শতাব্দীর রাজত্ব। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্ম এই কালা মানিকের শিক্ষা গ্রামে ও ঢাকায়। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে গ্র্যাজুয়েশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গন সংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে এম এ।

১৯৬৬ সনে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপে যোগদেন। একসাথে চলে শিক্ষা, ছাত্র রাজনীতি ও সঙ্গীত। মানে পিট সিগার ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ধারায় গণসংগীত ও গ্রাম বাংলার লোকজ ধারার পপ সঙ্গীত। দুই মাধ্যমেই তিনি সেই থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। সেই হৃদয় ছোঁয়া কথা ও সুর বাংলা ও বাঙালির জীবনে অনুরণিত হতে থাকবে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তার এই সঙ্গীত বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। বয়সে বালক হলেও সেই সময়ের মিছিলের একজন ক্ষূদ্র অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখেছি মিছিল ও সভা সমিতির আগে পরে। তখন গণসংগীত ছিল অবশ্যম্ভাবী। যা শুনে চেতনার আগুন জ্বলে উঠতো। বাংলাদেশে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তার কালজয়ী গান বাঙালির চেতনায় অনন্তকাল অনুরণিত হতে থাকবে। যে গানগুলো আমাদের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সাথী হয়ে আছে,তাহলো-

-ও সখিনা গেছোস কিনা ভূইল্যা আমারে
-মায়ের একধার দুধের দাম
-নাম তার ছিল জন হেনরি

তার লিখিত ও প্রকাশিত ব‌ইয়ের সংখ্যা নয়টি। তারমধ্যে চেনা চায়না, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও গণসংগীতের অতীত বর্তমান অন্যতম।

মানুষের হৃদয়ের পুরস্কার তার সাথে সব সময় ছিল। অসংখ্য প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের মধ্যে-

-১৯৯৯ এ রাষ্ট্রীয় একুশে পদক
-ম‌ওলানা ভাসানী পদক
-সিকোয়েন্স সম্মামনা পদক

উনার আর একটা গুন দেখেছি যে স্টেজে উঠে তিনি সব সময় একটা ভূমিকা দিতেন। তার মধ্য ম‌ওলানা ভাসানী, পিট সিগার ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে গণমানুষের প্রশস্তি থাকত।

তারসাথে সমানা সামনি দেখা ও কথা বলার বিরল সুযোগ আমার হয়েছিল। সালটা মনে হয় ১৯৭৯। আমরা দেবেন্দ্র কলেজে ছাত্রলীগ করি। ঐ সময় নবীন বরন, নির্বাচনের প্যানেল পরিচিতি ও সম্মেলনে ঢাকা থেকে শিল্পী আনার রেওয়াজ ছিল। আনিস ও ইকবাল ভাইয়ের গাইডেন্স-এ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কাজটা আমাকে করতে হত। আমাকে সহযোগিতা করত এফ রহমান হলের নির্বাচিত ভি পি রহিম ভাই। একবার গেলাম শিল্পী নিগার সুলতানাকে সাথে নিয়ে ফকির আলমগীর এর বাসায়। তো উনার ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্যের কাছে আমার মত পিচ্চির কথা বলাই দায় ছিল। তবুও নিগার সুলতানা, রহিম ভাই ও আমি মান্না ভাইয়ের (ডাকসুর ভি পি) কথা টথা বলে স্বল্প পারিশ্রমিকে উনাকে মানিকগঞ্জে নিতে পেরেছিলাম। পুরো ব্যপারটা ছিল বাঘের সাথে ইঁদুরের কথোপকথন। তবুও আমার কাছে গর্বের।

মহামারীর করাল গ্রাসে অকালে বিদায় নিলেন তিনিও। এই মহামারী পৃথিবীকে স্বজন ও বন্ধুশূন্য করে দিচ্ছে। আর কত শোক সাগরে আমাদের ভাসতে হবে তা অনাগত ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। শত কোটি শ্রদ্ধা এই পরিপূর্ণ ও গুনী স্বজনকে।

কড়চা/ এম এস

Facebook Comments
ভাগ