রিনা/ আয়েশা স্নেহা

রিনা

আয়েশা স্নেহা

আপু, আজকে কত তারিখ? বিষন্ন মুখে জিজ্ঞেস করে রিনা।
আপু নরম গলায় বলে, ৯ সেপ্টেম্বর।
রিনা বড্ড রেগে বলে, আর কত দিন থাকবো হাসপাতালে আপু। মনেও নেই কবে এসেছি।
প্রতিবারের মত তার বড় বোন এবারও উত্তর দেয় যে তাকে আর মাত্র কিছু দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। কিন্তু তার বোনের উত্তর রিনাকে আর সন্তুষ্ট করে না। রিনা cystic fibrosis নামে এক প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত। বছর খানেক হলো সে ও তার পরিবার জানতে পেরেছে তার এই রোগের কথা। cystic fibrosis বংশগত একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে তার দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে তার recovery (পুনর্লাভ) প্রায় অসম্ভব। এত কথা যদিও রিনা জানে না। সে খালি স্বপ্ন দেখে আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার। কখন সে আবার তার বন্ধুদের সাথে খেলা করতে পারবে। আবার দুলনায় ঝুলতে পারবে। খোলা আকাশের নিচে প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে। রিনা খুব দুরন্ত একটি মেয়ে। তার মায়াবী চোখের দিকে তাকালে যে কেউ তাকে ভালোবেসে ফেলবে।

রিনা তার বোনের উদ্দেশ্যে বলে, আপু তুমি বাবাকে বলো তো এসব ওষুধ খেতে ভালো লাগে না। আমি মায়ের হাতের পায়েশ খাবো।
বড় বোন বলে, আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোর জন্য কাল পায়েশ বানিয়ে নিয়ে আনবো।
রিনা অভিমানের স্বরে বলে, না আপু আমি মায়ের বানানো পায়েশই খাবো।
রিনার বোন নিশ্চুপ বসে থাকে।

রিনার বয়স এখন ৪ বছর। ৬ মাস আগে রিনা তার মা’কে হারিয়েছে। তিনিও একই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা তার মায়ের নিকট ঘনিষ্টতার কারণে রিনার এ অসুখ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে cross infection. এর কারণে রিনার শরীরে ভয়াবহ Germs এবং Bacteria এর সংক্রমণ ঘটেছে। এ অবস্থায় চিকিৎসা অনেক কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ফুসফুস দ্রুত গতিতে অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

মাকে বড্ড ভালোবাসত রিনা। সে সারাদিন মায়ের পাশে বসে বসে গল্প শুনত। রাজা-রানির গল্প, বাঘ মামার কাহিনী, আরও কত কি। কিন্তু মা যে আর তাকে গল্প শুনায় না। রিনা জানে তার মা গ্রামের বাড়িতে আছেন। মায়ের মৃত্যুর কথা তাকে জানাতে বারণ করেছেন ডাক্তার।

এর মধ্যে তার পরিবারের উপর আর্থিক চাপ বেড়েই চলছে। তার বাবা ব্যবসায়ী। আয় ভালোই ছিল। কিন্তু রিনা’র মায়ের চিকিৎসার খরচ মিটাতে গিয়ে তিনি অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর উপর করোনা ভাইরাস দেশে আসার পর থেকে ব্যবসায়ও ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। বাবা তার না বলা হাজার বেদনা বুকে চেপে রাখেন। রিনাকে বুঝতে দেন না কিছু। কিন্তু রিনা বাবার চোখে বেদনা ছাপ স্পষ্ট দেখতে পায়। তার বাবা রিনাকে কথা দিয়েছে যে সে সুস্থ হলে তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন। রিনার বাবা তার জন্য পুতুল, চকলেট, গল্পের বই নিয়ে আসেন।

বাবা নার্সকে জিজ্ঞেস করেন, আমার মেয়ের এখানে কোন কষ্ট হচ্ছে না তো। নার্স বিরক্ত স্বরে বলেন, না। আমরা ওর যথেষ্ট যত্ন নেই।

রিনার বোন প্রতি রাত জেগে থাকে। বালিশে মুখ চেপে সে সারা রাত কান্না করে। চিকিৎসক তাদের বাবাকে বলেছেন রিনার অপ্রতিরোধ্য ফুসফুসের সংক্রমণ ঘটেছে। রিনার বোন জানে মায়ের মত ফাঁকি দিয়ে রিনাও তাকে ছেড়ে চলে যাবে। রিনা ছাড়া তার বন্ধু বলতে আর কেউ নেই। রিনাই তার জীবনের সবচেয়ে আপন। ছোট বোনের সকল বায়না সে মিটাতে চেষ্টা করে।

বাবা এখন বাসায় এসে আর ঠিক মত খান না। তিনি খালি ভাবেন কোথা থেকে টাকা যোগাড় করা যায়। এই বিপদের সময় রিনাদের পরিবারের পাশে কেউ নেই। সব আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবরা যে পর হয়ে গিয়েছেন। তার উপর রিনার বাবাকে কত কথাই না শুনতে হয় সমাজ থেকে। রিনার বাবার মনে হতে থাকে পৃথিবী যেন টুকরো টুকরো যাচ্ছে; তিনি ঢুকে পড়ছেন এর ভিতরে।

হাসপাতালে আরও ৬ মাস মাস চলে যায় রিনার। তার রোগের জটিলতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। খরচ মিটাতে গিয়ে রিনার বাবাকে সমস্ত ব্যবসাটাই নষ্ট করে ফেলেন। পারিবারিক সম্পত্তিও বিক্রি করেন। এরপরও বেশ বড় অংকের ঋণী হয়ে পড়েন রিনার বাবা। বাবা তার বিপদের কথা চিকিৎসকদের জানান। চিকিৎসকদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। তাঁর হাতে আর কোন টাকা নেই। চিকিৎসকরা বিষয়টি বুঝেন। রিনার বাবাকে জানান, এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। তাঁদের হাতে কিছু নেই। হাসপাতালে রোগী থাকলে সেবা নিতে হলে খরচ দিতেই হবে। শত কষ্টের মাঝেই বাবা চালিয়ে যান চিকিৎসা খরচ।

কিন্ত ৯ এপ্রিল ২০২০ চলে আসে আকাশ ভাঙ্গা বিষাদের খবর। রিনাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরিবারে নেমে আসে বিশাল শোক। অল্প সময়ের মধ্যে ঘটল মা এবং মেয়ের মৃত্যু। রিনার মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল না। ছোট ফুটফুটে রিনার মুখে এক অম্লান হাসি মৃত্যুর পরও বিরাজমান। বড় বোনের কষ্ট। সে আর রিনাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতে পারলো না।

১২ এপ্রিল ২০২০-এ রিনাদের বাড়িতে ঘটল আর এক ঘটনা। রিনার বাবার ঋণের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তিনি বসত বাড়িটাও বন্ধক রেখেছিলেন। এদিন পাওনাদার তাদের বাড়িটাও দখল বুঝে নেন। রিনার বোন এবং বাবা নিঃস্ব হয়ে পথে বসে যায়। বেদনাতুর রিনার বোন বলে, বাবা যে বাড়িতে আমরা রিনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি। সে বাড়ি অন্য কারো হলেও আমার কোন আফসোস নেই।

কড়চা/ এ এস

Facebook Comments
ভাগ