সৃষা’র জন্মদিন/ রুহুল ইসলাম টিপু

২০১৮ সালে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর এর সামনে সৃষা।

সৃষা’র জন্মদিন

রুহুল ইসলাম টিপু

সৃষা আমার তৃতীয় কন্যা সন্তান। জন্ম তারিখ ১৮ মার্চ ২০১০। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ১৭ মার্চ ১৯২০। বঙ্গবন্ধু এবং সৃষার জন্মের সাথে সময়ের পার্থক্য ৯০ বছর ১ দিন। আমি, আমার মেয়েরা এবং পরিবারের সদস্যবর্গ খুব গর্ব করে বলে থাকি বঙ্গবন্ধু’র জন্মের পরের দিন সৃষা’র জন্ম। বাংলাদেশি এবং একজন বাঙালি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমাদের অহংকারের সীমা নেই। বর্তমান এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাথে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনুশীলন এবং চর্চার উপর বাংলাদেশের উৎকর্ষতার রয়েছে বড় নিবিড় সম্পর্ক।

মন্ত্রী ও রাজনীতিক রাশেদ খান মেনন এর হাত থেকে বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার গ্রহণ করছে সৃষা।

১৮ মার্চ ২০২১-এ এসে সৃষা ১১ বছর অতিক্রম করে ১২ তে পা রাখবে। বয়স আমাকেও বেশ ভার করেছে। প্রথম সন্তান শ্রেয়া ঘরে এলো ১৯৯৮ সালে। ২ বছরের মাথায় ধরা পড়ে শ্রেয়া অটিজমে আক্রান্ত। আমার স্ত্রী এবং আমি দিশেহারা হয়ে একটি উপলব্ধি খুঁজে পেয়েছিলাম। শ্রেয়ার একজন বোন বা ভাই প্রয়োজন। ২০০৫ সালে আমাদের দ্বিতীয় সন্তান স্নেহা’র জন্ম। বাংলাদেশের প্রতি প্রান্তে ঘুরে দেখা আমার বেশ আগ্রহ। ঢাকার বাইরের আমন্ত্রণ পেলেই ছুটে যাই সেখানে। স্থানীয় মানুষের সাথে বন্ধুত্ব, সখ্যতা এবং দেশের উন্নয়নের ছোঁয়ায় নিজেকে জড়ানোর মাঝে ভিন্ন ধরণনর আনন্দের পরশ অনুভব করি। হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড এর কান্ট্রি ডিরেক্টর বন্ধু আতাউর রহমান মিটন আমন্ত্রণ জানালেন পঞ্চগড়ের বোদায় প্রকল্প পরিদর্শনের। সময় ২০০৯ সাল। হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ০৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করবে। স্থানীয় কৃষক এবং হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড এর উৎপাদিত পণ্য নিয়ে কৃষি মেলার আয়োজন। জৈব ও কেঁচো সার, গরু পালনের পদ্ধতিসহ স্থানীয় কৃষকের স্বাস্থ্যসেবা পরিপালন সবই উপভোগ করি। একদিনের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। মিটন ভাই এবং হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড এর কর্মীদের আথিথেয়তা ছিল অতুলনীয়।

ঢাকায় এসে দেখি স্ত্রী রুনা খুব অসুস্থ, লক্ষণ জ্বর। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেই জানতে পারি স্ত্রী অন্ত:সত্ত্বা। আকাশ ভাঙা সংবাদ। স্নেহা’র ৪ বছর। শ্রেয়া অটিস্টিক, বয়স ১১। এ অবস্থায় আরও একটি সন্তান। চিকিৎসকের সাথে আমাদের পূর্ব পরিচিতি ছিল; তাই তাঁর বকুনি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায়ই ছিল না। স্ত্রী অনাগত তৃতীয় সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ভীষণ কঠিন সময় পার করছি। জুন ২০০৯ হতে ১৮ মার্চ ২০১০ পর্যন্ত একদিনের জন্য সৃষা’র মা সুস্থ ছিলেন না। জ্বর, ঠান্ডার সাথে একদিন শিল পাটা পড়ে যায় তার পায়ের উপর।

দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) মোহাম্মদপুরে ভর্তি করি যথাসময়ে। ডাঃ দিবালোক দাদা’র প্রতিষ্ঠান। তাঁর বাবা কমরেড মনি সিংহ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মহান রাজনীতিক। ১৮ মার্চ ২০১০ বৃহস্পতিবার বিকেলে পৃথিবীর আলোতে চলে আসে আমাদের সৃষা।

জন্মের পর মুহূর্তে সৃষা।

শ্রেয়া, স্নেহা এবং সৃষা’কে নিয়ে আমাদের পৃথিবী। জন্মদিনে কষ্টের কথা আর নয়। সংগ্রাম এবং উদযাপন দুটোই থাকবে। সৃষা জুলাই ২০২১ এ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠবে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় এক বছর ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখেছিল। ফ্রেঞ্চ ভাষায় রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন করেছিল স্কুলের একটি প্রোগ্রামে। লালন গীতিও তার গলায় ভালো মানায়। করোনা এবং চর্চার অভাবে এ বিদ্যাটি এখন হারিয়ে যাচ্ছে। গান শিখতো। এখন আর হারমোনিয়াম ধরে না। ছবি কদাচিৎ আঁকে। একবার বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছিল। শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা নিয়মিতকরণের অংশ হিসেবে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরেও আমরা দলগতভাবে গিয়েছিলাম।

১১ বছরের সৃষার বড় গুণ, তার বড় বোন শ্রেয়াকে সকল সময় আগলে রাখে। বড় বোনের নিকট হতে যা পাওয়ার কথা সেটি তো হবার নয়। এ প্রতিবন্ধকতা আমি এবং আমার পরিবার বহু পূর্বেই গ্রহণ করেছি। আমার স্ত্রী’র কথাই সত্যি হলো, শ্রেয়াকে দেখার এবং প্রতিপালনের সৃষা-স্নেহা’ই বড় অবলম্বন।

জন্মদিনে সৃষা’কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন! শ্রেয়া’র ন্যায় অসংখ্য পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে এসো আমরা নিজেদের সামর্থ এবং সক্ষমতাকে সাথে নিয়ে কাজ করে যাই। জন্মদিনে এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আমি পিছিয়ে পড়া গোত্রের সকল মানুষের বাবা, সৃষা-স্নেহা তাদের বোন। তাদের বাদ দিয়ে জন্মদিন উদযাপনের আনন্দ পূর্ণতা পাবে না। পৃথিবীকে আরও একটু আলো উপহার দিবে আমার সৃষা। সৃষা’র জন্ম সার্থক হোক!

Facebook Comments
ভাগ