আমরা কিশোরী, বাল্যবিবাহ রোধ করি/ রাশেদা আক্তার

আমরা কিশোরী, বাল্যবিবাহ রোধ করি

রাশেদা আক্তার : “নারী-পুরুষে বৈষম্য হ্রাস করি, বহুত্ববাদী সমাজ গড়ি” স্লোগানকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (৮ জুন) সকাল ১০.০০ টায় মানিকগঞ্জ স্যাক কার্যালয়ে জেন্ডার, বৈচিত্র্য, আত্মনির্ভরশীলতা ও বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে কিশোরীদের অংশগ্রহণে নারীর ক্ষমতায়নে নেতৃত্ব বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক তথা শারীরিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মানিকগঞ্জ পৌরসভা ও কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৬ টি গ্রামের ১৬ জন কিশোরী এতে অংশগ্রহণ করে।

শুরুতেই বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায় কর্মশালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরে বৈচিত্র্য, আত্মনির্ভরশীলতা ও বহুত্ববাদী সমাজ বিষয়ে আলোচনা করেন।

করোনা মহামারীর কারণে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ ব্যাপক ভাবে বেড়েছে। বেড়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন। করোনা মহামারী বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কিশোরীরা ঘরের মধ্যে এক ধরনের বন্দী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। বাড়িতে লেখাপড়া ঠিকমত করছে না। বিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাসের আওতায় সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসলেও গ্রামের কিশোরীরা দারিদ্র্যতা ও অসচেতনতার কারণে এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেকে আবার অনলাইন ক্লাস করার নামে সুযোগের অপব্যবহার করছে। অনেকেই ফেইসবুক আসক্ত হয়ে পড়ছে। মা-বাবা সামাজিক নিরাপত্তার কথ ভেবে অভিভাবকেরা মনে করছে এই পরিস্থিতিতে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। বিয়ে হলে তাদের আর কোন ঝামেলা নেই বলে তারা মনে করছেন। অভিভাবকদের এই ধরনের মানসিকতার কারণে অনেক কিশোরী শিকার হচ্ছে বাল্যবিবাহের। সেই সাথে বাড়ছে নির্যাতন ও সহিংসতা।

বারসিক নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ রোধসহ নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কিশোরীদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। কাজের ধারাবাহিকতায় গ্রাম পর্যায় গড়ে উঠেছে কিশোরী সংগঠন। কিশোরীরা বাল্যবিবাহ রোধে নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে। কিশোরীদের এই কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে, তাদের কাজকে আরও বেগবান করতে, বিাল্যবিবাহ, শিশু-কিশোরী ও নারী নির্যাতন রোধ করতে এবং কিশোরীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে গঠন করা হয় কিশোরী ভলেন্টিয়ার টিম। মানিকগঞ্জ পৌরসভা ও সদর উপজেলার ৬ জন কিশোরীকে ৬ টি গ্রামের টিম লিডার করা হয়। এদের মধ্যে অন্তরা রাজবংশীকে জয়নগর, তাহিয়া আক্তারকে আন্ধারমানিক, একা দাসকে নওখন্ডা, সুমি দাসকে সরুন্ডী, সুমাইয়া আক্তারকে চরমত্ত ও শ্রাবন্তী দাসকে চর হিজুলী গ্রামের টিম লিডার করা হয়। তারা গ্রামের বাল্যবিবাহ, শিশু-কিশোরী ও নারী নির্যাতন রোধে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী টিম লিডার অন্তরা রাজবংশী বলেন, আমি আমার এলাকায় বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করবো। এখানে এসে আমার খুব ভাল লেগেছে।

সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমি প্রত্যয় কিশোরী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। আজ কিশোরী ভলেন্টিয়ার টিমের টিম লিডার হতে পেরে ভাল লাগছে। আমি আমার গ্রামের বাল্যবিবাহ বন্ধে মায়েদের সচেতন করবো। বাল্যবিবাহ রোধ করবো। সেই সাথে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপন করবো।

একা দাস বলেন, আমি আমার পাড়ায় কারো বাল্য বিবাহ হতে দেবনা। বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করবো।

মহামারী করোনার কারণে বাল্যবিবাহ ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হার। ২০২৫ সালের মধ্যে ২৫ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল গার্ল হুড প্রতিবেদনে।

বাল্যবিবাহ অভিশাপ। দেশের উন্নয়নে সব সময়ই বাঁধা। যদিও সরকারি-বেসরকারি পর্যায় বিভিন্ন ভাবে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বাল্য বিবাহ রোধে। বাল্যবিবাহ রোধে কিশোরীদের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিশোরীরা সফল হোক। কিশোরীদের হাত ধরেই বন্ধ হোক বাল্যবিবাহ, রোধ হোক শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা। গড়ে উঠুক বৈষম্যহীন বহুত্ববাদী সমাজ। যে সমাজে সকলে বসবাস করবে পরস্পর আন্ত:নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে তার নিজস্ব মর্যাদার সাথে।

কড়চা/ আর এ

Facebook Comments
ভাগ