নাফ নদীতে জেলেদের কান্না থামবে কবে?/এম আর লিটন

নাফ নদীতে জেলেদের কান্না থামবে কবে?

এম আর লিটন

গত শনিবার সকাল ৭টা টেকনাফের নাফ নদীতে তখনো কুয়াশা কাটেনি তিনটি নৌকায় জেলেরা জাল ফেলছিলেন হঠাৎ কয়েকটি স্পিডবোট এসে তাদের ঘিরে ফেলে একদল সশস্ত্র লোক অস্ত্রের মুখে ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমারের ভেতরে এই ঘটনার পেছনে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি জড়িত এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা না এই বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ফল

স্থানীয় ও গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০০ জন বাংলাদেশি জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি তাদের মধ্যে ১৭১ জন এখনো মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি একই সঙ্গে ৩২টি ট্রলার সেখানে পড়ে আছে এটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার খবর নাফ নদীর শান্ত জল আজ অশান্ত হয়ে উঠেছে ওই পানিতে লুকিয়ে আছে এক গভীর আতঙ্ক

কেন নাফ নদী এখন এতটা অশান্ত? উত্তর লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের গত কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে অং সান সুচির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে জান্তা বাহিনী শুরু করে চরম দমনপীড়ন কিন্তু সাধারণ মানুষ দমে যায়নি শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ এই প্রতিরোধই জন্ম দেয় এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের

চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত জান্তা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন ৩৬ লাখ মানুষ এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আরাকান আর্মি ২০০৯ সালে ছোট আকারে যাত্রা শুরু করলেও এখন তারা রাখাইন রাজ্যের অঘোষিত শাসক তারা এখন আর কেবল একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয় তারা একটি আধারাষ্ট্রীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে

২০২৩ সালের শেষেঅপারেশন ১০২৭শুরু হওয়ার পর জান্তা বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশমিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরাকান আর্মির হাতে মংডু ও বুথিডংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলকাগুলো এখন তাদের দখলে বর্তমানে মিয়ানমারের মাত্র ২১ শতাংশ এলাকা জান্তা সরকারের অধীনে বাকিটা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে এই পরিবর্তন আমাদের সীমান্তের নিরাপত্তা সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে

আরাকান আর্মি কেন সাধারণ জেলেদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে? এর পেছনে আছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল প্রথমত তারা দেখাতে চায় এই এলাকার আসল মালিক তারা নাফ নদীতে তাদের দাপট বজায় রাখার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে একটি বার্তা দিচ্ছে তারা বোঝাতে চায় জান্তা সরকারের দিন শেষ এখন থেকে এপারে কথা বলতে হলে তাদের সঙ্গেই বলতে হবে

দ্বিতীয়ত জিম্মি সংকট তৈরি করে তারা দর কষাকষির সুযোগ খোঁজে অনেক সময় মুক্তিপণ আদায় বা নৌকাগুলো নিজেদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহারে এসব করে নাফ নদীর ওই নৌকাগুলো তাদের মূল্যবান সম্পদ ইঞ্জিনের নৌকাগুলো তারা রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহার করে

সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ গত ফেব্রুয়ারিতে আরাকান আর্মি ৭৩ জন বাংলাদেশি জেলেকে মুক্তি দিয়েছিল এটি ছিল তাদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা কিন্তু মাস ঘুরতেই আবার ১৩ জনকে অপহরণ করা হলো এটি কি তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিশৃঙ্খলা নাকি দ্বিমুখী নীতি, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে

রাখাইন রাজ্য এখন কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই এখানে চীন ও আমেরিকার স্বার্থ জড়িয়ে আছে চীনের কাছে রাখাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাদেরবেল্ট অ্যান্ড রোডপ্রকল্পের আওতায় কিয়াউকপিউ বন্দর দিয়ে তারা সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে চায় তাই চীন একদিকে জান্তা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে অন্যদিকে আরাকান আর্মির সাথেও গোপন যোগাযোগ রাখছে তাদের মূল লক্ষ্য যেভাবেই হোক নিজেদের ব্যবসায়িক করিডোর নিরাপদ রাখা

অন্যদিকে আমেরিকা চাচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে তারা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে এই দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় মাঝখান থেকে পিষ্ট হচ্ছে আমাদের সীমান্ত ও সাধারণ জেলেরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার চেয়ে এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বড় দেশগুলোর আধিপত্যের লড়াই এই লড়াইয়ে রক্ত ঝরছে আমাদের সাধারণ মানুষের

বাংলাদেশ এখন এক কঠিন কূটনীতির সামনে দাঁড়িয়ে একদিকে জান্তা সরকার, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের ক্ষমতাধর আরাকান আর্মি গত কয়েক বছরে আমাদের কৌশল ছিল দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখা কিন্তু ১৩ জেলের অপহরণ প্রমাণ করে ওই কৌশলে বড় ধরনের ফাঁক আছে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে

সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি নাফ নদীতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল কেবল বাড়ালেই হবে না প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে ড্রোন নজরদারি বাড়িয়ে প্রতিটি নৌকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি আমাদের জেলেরা কোন এলাকায় জাল ফেলছেন, তা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকা দরকার

জেলেদের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে যেহেতু আরাকান আর্মি এখন সীমান্তের ওপারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রক, তাই তাদের সঙ্গে কার্যকরী ও কঠোর আলোচনার বিকল্প নেই আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না জান্তা সরকারকে জানিয়েও লাভ নেই, কারণ ওই এলাকায় তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তাই বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

শাহপরীর দ্বীপের জেলেরা ঝুঁকি জেনেও পেটের দায়ে নদীতে নামেন সরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার নিরাপদ ব্যবস্থা করা দরকার তাদের জীবন ও জীবিকার মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, তার অবসান ঘটাতে হবে না হলে অভাবের তাড়নায় তারা বার বার এই মরণফাঁদে পা দেবেন

মিয়ানমারের এই অস্থিরতা আমাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেও অনিশ্চিত করে তুলছে রাখাইন রাজ্যে যদি শান্তি না ফেরে তবে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরতে চাইবে না আবার আরাকান আর্মি যদি সেখানে স্থায়ী শাসক হয়, তবে তাদের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হবে তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বা অধিকারের বিষয়ে কতটা আন্তরিক হবে, তা এখনো বড় প্রশ্ন

আসিয়ান বা জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে চীন ও আমেরিকার মতো প্রভাবশালী দেশগুলোকে এই সংকটে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে বাধ্য করতে হবে আঞ্চলিক শান্তি বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব সবার ওপর পড়বে এই বার্তাটি দরবারে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে

নাফ নদীর পাড়ের মানুষগুলোর জীবন আজ সুতোর ওপর ঝুলছে প্রতিদিন ভোরে তারা যখন নদীতে নামেন, জানেন না সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবেন কি না ওই ১৩ জন জেলের পরিবার এখন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে তাদের মধ্যে ১৭ বছরের কিশোর থেকে ৫৫ বছরের বৃদ্ধ আছেন তাদের অপরাধ কি? নিজের জলসীমায় মাছ ধরতে চেয়েছিলেন

প্রতিবেশী দেশের সংঘাত আমাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে আরাকান আর্মির উত্থান বা জান্তার পতন আমাদের হাতে নেই কিন্তু আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব সীমান্তের বেড়া যতই উঁচু হোক, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকলে তার কোনো মূল্য নেই প্রতিটি নাগরিকের জীবনের দাম সমান হওয়া উচিত

শাহপরীর দ্বীপের ওই হাহাকার থামানো এখন সময়ের দাবি নাফ নদীর ওপারে কারা শাসক, সেটা বড় কথা নয় এপারে যারা আছেন, তারা বাংলাদেশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে না হলে নাফ নদীর এই করুণ সুর একদিন বড় কোনো বিপদের সংকেত হয়ে দেখা দেবে আমাদের জেলেরা মুক্তি পাক সীমান্ত নিরাপদ হোক নাফ নদীর জল আবার শান্তির বার্তাবাহক হোক

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

Facebook Comments Box