এ যুগের আসমানী ঘিওরের সুফিয়া

আব্দুর রাজ্জাক : পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অনবদ্য সৃষ্টি ‘আসমানী’ কবিতাটি পড়ে অনেকেরই হৃদয় ভিজেছে, আবার কেউ কেউ ছুটে গিয়েছেন আসমানীকে দেখতে। রসুলপুরের সেই আসমানী আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। কিন্তু তার মতো অসংখ্য আসমানীরা বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছেন। মূলত আসমানী চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বোঝাতে চেয়েছেন। নিদারুণ দারিদ্র্যের ও সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাঝে একটি মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে, সেই অবস্থা পরিপূর্ণ উপস্থাপন করতে চেয়েছেন কবি জসীমউদ্দীন। আপনাদের এ যুগের এক আসমানী সুফিয়া আক্তারের জীবন সংগ্রামের কথা বলব।

সুফিয়া আক্তার, রোগাক্রান্ত, জীর্ণ-শীর্ণ দেহের একটি মেয়ে। ত্রিশ বছর বয়সী এই মেয়েটিকে দেখলে মনে হবে তার জীবন নামচায় বিধাতা কি শুধু কষ্টই লিখে রেখেছেন? মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত তরা (মির্জাপুর) গ্রামের এক ছুপড়ি ঘরে বসবাস। খুব অল্প বয়সে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়ে যায়। সেসময় বিয়েকে সে ভেবে নিয়েছিলেন বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন, নতুন জীবন। কিন্তু তার স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন হতে সময় নেয়নি। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, জামাই-ননদের অত্যাচারে সে আজ স্বামী গৃহহীন। স্বামীগৃহ ছাড়ার ঘটনাটি স্বাভাবিক নয়, যথেষ্ট বেদনাদায়ক।

এইতো কয়েকবছর আগের ঘটনা, সুফিয়া আক্তারের স্বামী নির্মম অত্যাচার করে তাকে কালীগঙ্গা নদীর ওপর তরা ব্রীজ থেকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। মাছ ধরার জেলেরা তাকে নদী থেকে অর্ধমৃত অবস্থায় উদ্ধার করে, স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আজ সে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। তবে, সেই ঘটনার দাগ আজও রয়ে গেছে। এখন প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন। আশ্রয় হয়েছে গরীব বাবার ঘরে। বাবা মেয়েকে ফেলে দিতে পারেননি। তবে বাবার নুন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা। বাবার নাম আবুল কাশেম। বয়স প্রায় আশির উর্ধে। তিনি রাস্তায় রাস্তায় হকারি করে পত্রিকা বিক্রি করতেন। এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কোনো কাজ করতে পারেন না। কোনো জায়গা জমি নেই। আছে শুধু এই বসত ভিটা টুকু। তবুও নেই একখানা ঘর। ভাঙা টিনের এই ছাপড়া ঘরে আবুল কাশেম, তার স্ত্রী ও এই মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েকে নিয়ে থাকেন। কোনো ছেলে সন্তান নেই। তার মোট চারজন মেয়ে। বড় মেয়ের নাম জরিনা আক্তার, মেঝো মেয়ের নাম নুরজাহান আক্তার, সেজো মেয়ের নাম রোকেয়া আক্তার। আর ভারসাম্যহীন ছোট মেয়ের নাম সুফিয়া আক্তার। সম্প্রতি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেছে সুফিয়ার হাত। এখন হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে পারে না। অর্থাভাবেই চিকিৎসা করাতে পারেনি। ভাঙা হাত নিয়েই জীবনযাপন করছে।

করোনার এই দু:সময়ে তাদের ঘরে এখন নিয়মিত কোনো খাবারই থাকে না, সেখানে ইফতার করা তাদের জন্য এক দূরহ ব্যাপার। তবুও তারা রোজা রাখে। তাদের এমন কষ্টকর পরিস্থিতিতে পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান দিশারী। দিশারীর ঘিওর উপজেলা শাখার সভাপতি ও কয়েকজন সদস্য মিলে তাদের বাড়ি পৌঁছে দেয় ইফতার ও খাদ্য সামগ্রী। তারা ভালো করে খোঁজ খবর নেন এবং তাদের পাশে থেকে বড় ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।

দিশারীর ঘিওর উপজেলা শাখার সভাপতি মোহম্মদ রাতুল শেখ বলেন, খুব কষ্ট পেলাম। ঘরের অবস্থার দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারবেন, কি দুর্বিষহ তাদের অবস্থা। আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ আছেন, তারা এসব মানুষদের দিকে একটু সুনজর দিলেই তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে, তারাও আমাদের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

কড়চা/ এ আর

Facebook Comments
ভাগ