কমরেড মিজানুর রহমান হযরতের প্রস্থান, এক অকুতোভয় সংগ্রামীর জীবনাবসান/ দীপক কুমার ঘোষ

মানিকগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইন পেশা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান এক অবিচল ব্যক্তিত্ব—বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কমরেড মিজানুর রহমান হযরত। সবার কাছে তিনি ‘হযরত ভাই’ নামেই পরিচিত ছিলেন। প্রতিবেশী, সহযোদ্ধা, সহদলীয় কর্মী হিসেবে তার দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিতে যেমন রয়েছে সংগ্রাম, তেমনি রয়েছে মানবিকতা, সততা আর নীরব শক্তির এক অনন্য উপস্থিতি। দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে লড়াই শেষে গতকাল (১৬ নভেম্বর) তিনি অনন্তলোকে যাত্রা করলেন।
শেষ বিদায়
আজ (১৭ নভেম্বর) সকাল ১১টায় দেবেন্দ্র কলেজ মসজিদ প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির প্রথা অনুযায়ী বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ মহোদয়ের সভাপতিত্বে আদালত প্রাঙ্গণে কোর্ট রেফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেলা বারোটায় আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে তার স্মরণে শোকসভা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরের মানুষ, সহকর্মী আইনজীবী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ীদের ভিড়ে মিলনায়তনটি পরিণত হয় শোকাহত শ্রদ্ধার অঙ্গনে।
এক সংগ্রামী নেতার চার বৈশিষ্ট্য

হযরত ভাইয়ের পুরো জীবনটাই ছিল আদর্শ, নীতি ও সততার অনন্য উদাহরণ। তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের চারটি বৈশিষ্ট্য ছিল সর্বাধিক অনুপ্রেরণাদায়ক—
১. পেশাগত জীবনে ছিলেন দক্ষ, নিষ্ঠাবান ও সৎ।
২. ছিলেন রীতিমতো স্বল্পভাষী—অল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ ছিল তার স্বভাব।
৩. দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি ছিলেন পরম আপসহীন।
৪. কথার সঙ্গে কাজের মিল রেখে চলতেন—যা আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে।

স্মৃতির খাতায় অম্লান কিছু মুহূর্ত

৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমরা যখন একসঙ্গে রাজপথ কাঁপিয়েছি, তখনই তার চরিত্রের দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারাবরণ, পালিয়ে থাকা, রাজপথে স্লোগান—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অগ্রভাগে, সাহসী ও নির্ভীক।

একটি স্মৃতি আজও অমলিন। দলের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ে করতে হলে তাকে দলের অনুমতি নিতে হয়েছিল। বর্ষা মৌসুম—মানিকগঞ্জ বাজার লঞ্চঘাট থেকে আমরা ছয়জন সম্পাদকমণ্ডলী সদস্য এক মাল্যা নৌকায় চড়েছিলাম। নৌকাটি ভাটির টানে সিঙ্গাইরের দিকে এগোচ্ছিল। মাঝপথে নৌকার ওপরই শুরু হয় সম্পাদকমণ্ডলীর সভা, যেখানে কমরেড আজহার ভাইসহ আমরা উপস্থিত। সেই ভাসমান সভায় হযরত ভাইয়ের বিয়ের আবেদন অনুমোদিত হয়। পরে আমরা বরযাত্রী হয়ে তার বিয়েতে অংশ নেই। আজও মনে হয়—কতো অনাড়ম্বর, কতো আন্তরিক ছিল সেই বন্ধন, সেই সহযোদ্ধার সম্পর্ক।

এক নির্মল যোদ্ধার বিদায়

সততা ও সংগ্রামে পরীক্ষিত এই নেতার মৃত্যুতে আইনজীবী সমাজ, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবান মানুষ—সবাই গভীর শূন্যতা অনুভব করবে। তার জীবনদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক, আজও অনুপ্রেরণা।

কবির ভাষায়—
“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় হযরত ভাই—
আপনার সংগ্রাম, আপনার আদর্শ, আপনার নীরব শক্তি আমাদের পথ দেখাতে থাকবে চিরদিন।

Facebook Comments Box