ঘিওরে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর নিয়ে অর্থবাণিজ্য

কড়চা রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর নিয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী এলাকায় চলছে অর্থ বাণিজ্য। ভুক্তভোগী কেউ লাখ টাকার বিনিময়ে ঘর পেয়েছেন আবার কেউ কেউ টাকা দিয়েও ঘর পচ্ছেন না। এমন অভিযোগ উঠেছে উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও স্থানীয় কৃষকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা দাবি করে মানুষজনের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে গরীরের ঘাম ঝরানো অর্থ পকেটবন্দি করেছেন ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক এই নেতা। বছর পেরিয়ে গেলেও ঘরের টাকা ফেরত না দেওয়ায় ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে কয়েকজন ভুক্তভোগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এদিকে অভিযোগ করার কারণে ভুক্তভোগীদের বাড়ি গিয়ে আইয়ুব খান বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ইকবাল হোসেন বলেন, আমি কৃষি কাজ করি। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বানিয়াজুরী ৩ নং ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব খান আমাকে ঘর দেয়ার প্রস্তাব দেন। বিনিময়ে ৭০ হাজার টাকা আমার কাছে চান। গরীব মানুষ এতো টাকা কোথায় পামু এ কথা মেম্বারকে বলা হলে তিনি আমাকে বলেন, টাকা ছাড়া ঘর পাওয়া যাবে না। পরে একটি পাকা ঘরের আশায় ক্ষেতের জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা উঠাই। সেখান থেকে মেম্বারকে নগদ ৭০ হাজার টাকা ঘরের বাবদ দেই। কিন্ত টাকা পাওয়ার পরও তিনি আমাকে কোন ঘর দেননি। মাসের পর মাস গড়িয়ে বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি আমাকে ঘর দিতে পারেননি এবং টাকাও ফেরত দেননি। আর টাকা ফেরত চাইলে তালবাহানা করে ঘোরাতে থাকেন। আমি স্ত্রী, সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। পরে নিরূপায় হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি।

ইকবাল হোসেন আরো বলেন, আমার অভিযোগের কথা শোনার পর থেকে মেম্বার আমার বাড়ি এসে কয়েক দফা আমার পা ধরে বসে থাকেন যাতে আমি কোন অভিযোগ না করি। তার কথা না শোনার কারণে তিনি আমাকে বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

আরেক ভুক্তভোগী বানিয়াজুরী এলাকার রিকশা চালক জাহিদ হোসেন ধারদেনা ও বাড়ির গরু বিক্রি করে মোট এক লাখ টাকা ইউপি সদস্য আইয়ুব খানের কাছে ঘর বাবদ দিয়েছেন। ঘর পেয়েছেন ঠিকই কিন্ত তিনি জানতেন না ঘর পেতে কোন টাকা পয়সা লাগে না। যখন জানলেন তার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা। শরীরের ঘাম ঝড়ানো অর্থ দিয়ে সরকারি ঘর পেয়েছেন তা মেনে নিতে পারছেন না।

জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথমে ৭০ হাজার টাকা মেম্বার আমার কাছ থেকে নিয়েছেন। এরপর বিভিন্ন কায়দায় আরো ৩০ হাজার টাকা নিয়ে আমাকে কোন রকম একটি ঘর দিয়েছেন। কিন্ত ঘরটি একবছর যেতে না যেতেই ধ্বসে ধ্বসে পরার উপক্রম দেখা দিয়েছে। কথা ছিল ৯ হাজার ইট দেবেন। সেখানে দিয়েছেন ৬ হাজার ইট। এছাড়া নম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে আমার ঘরটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং যেকোন সময় সেটি ধ্বসে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতে পারি। এমনকি জীবন ঝুকির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিষয়টি সু-বিবেচনা পূর্বক টাকাগুলো ফেরত পাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি বাধ্য হয়েই ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি।

হতদরিদ্র রিকশা চালক জাহিদ বলেন, আমি মূর্খ মানুষ, ঘর পেতে টাকা দিতে হয় তা জানতান না। যখন জানতে পেরেছি মেস্বার অবৈধভাবে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, তখন আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা। কারণ আমার শরীরের ঘাম ঝরানো টাকা কেনো আমি তাকে দিলাম। এছাড়া আমি অভিযোগ করার পর মেম্বার আমার বাড়ি এসে নানান ভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

ভুক্তভূগী কৃষক ইকবাল ও রিকসা চালক জাহিদ হোসেন ছাড়াও আরো কয়েক জনের কাছ থেকে ঘর দেয়ার কথা বলে ইউপি সদস্য আইয়ুব খান টাকা আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানিয়েছেন, ঘর দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা আইয়ুব খান নিয়েছিলেন। এক বছর ঘুরানোর পর ঘর না দিয়ে টাকা ফেরত দিয়েছেন। তবে টাকা উঠাতে গিয়ে নানান কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এছাড়া রাথুরা গ্রামের বিদেশ প্রবাসী রাসেল ৭০ হাজার টাকার বিনিমিয়ে তার মায়ের নামে একটি পাকা ঘর পেয়েছেন বলে ভুক্তভোগী ইকবাল হোসেন জানান।

অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মোঃ আইয়ুব খান টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি সরকারি ঘরের কথা বলে কারও কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেননি। সব ঘর চেয়ারম্যান দিয়েছেন। আমি কোন ঘর কাউকে দেইনি। এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। আসলে আমার পেছনে শত্রু লেগেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মিলে আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। কারণ আমি ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে পদত্যাগ করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে আমার দলের ভেতর থেকেই শত্রু তৈরি হয়েছে।

ঘিওর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অনেক সময়ই অনেকেই আমার কাছে নানান অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তার জানান, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানকে অবগত করা হয়েছে এবং অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

কড়চা/ এ আর

Facebook Comments
ভাগ