নারী নির্যাতন বিষয়ে মানিকগঞ্জে অনলাইন সংলাপ ও মতবিনিময় সভা

রিনা আক্তার, আছিয়া আক্তার, বিমল চন্দ্র রায় : এতো এতো সভা, আলোচনা, নাটক, মতবিনিময় করেও কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না ইভটিজিং? বাবা-মা’র চাপে, বাবা-মা ব্লাকমেলিং করে তুমি যদি এখন বিয়ে না করো তবে আমরা বিষ খাবো, আত্মহত্যা করবো ও অন্যান্য ভয় দেখায় তাই নিজেকে বলি দিতে হয়। প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনসহ অনেকে বলে, মেয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে তাকে বিয়ে দিয়ে দাও, এই বযসে বিয়ে দিলে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে। অনেক মেয়ে বাল্য বিবাহ’র শিকার হয়। বাল্য বিবাহ ফিরানোর চেষ্টা করা হয়। মেয়েরা ধর্ষনের শিকার হয়, বিয়েতে যৌতুক দিতে হয়, মেয়েরা ঘরের বাহির হলে ইভটিজিং এর শিকার হয় ,তাকেই মেনেই চলতে হচ্ছে। বাবা–মাকে বুঝাতে হবে আমরা বাল্য বিবাহ করবো না। পড়াশুনা করে বড় হয়ে চাকুরি বা আয়মূলক কাজ করে বিবাহ করবো। বাবা-মা আমাদের ভালো চায়, তারাও অনেক সময় অনেক দিক বিবেচনা করে বিয়ের আযোজন করে। তবে আমাদের সকল প্রতিকুলতাকেই জয় করে এগ্রিয়ে যেতে হবে। এই কথাগুলো অংশগ্রহনকারী কিশোরী শিক্ষার্থীদের।

বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) অনলাইন মাধ্যমে নারী বান্ধব সমাজ বিনির্মাণের নারীর প্রতি সংহিসতা ও নির্যাতন বন্ধে মানিকগঞ্জ জেলা নারী উন্নয়ন কমিটি ও বেসরকারি উন্নযন সংস্থা বারসিক এর যৌথ উদ্যোগে জেলা নারী উন্নয়ন কমিটির সভাপতি, জেলা পরিষদ সদস্য নারীনেত্রী ও উদ্দোক্তা শামিমা আক্তার চায়না এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট নারী নেত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কাজী সুফিয়া আক্তার। বক্তব্য রাখেন সমাজ সংগঠক অধ্যাপক শাহিন আক্তার, উন্নয়নকর্মী ও সমাজ সংগঠক রাশেদা আক্তার, শিক্ষার্থী সাথী আক্তার, রিমা আক্তার, সুমা সরকার, সাধনা মন্ডল, লিজা আক্তার, উন্নযনকর্মী আছিয়া আক্তার ও রিতু দাস প্রমুখ।

করোনাকালে নারীর প্রতি কি ধরনের প্রভাব পড়েছে? এই বিষযে একটি গবেষনাপত্র উপস্থাপন করেন বারসিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বারসিক আঞ্চলিক সমন্বযকারী বিমল চন্দ্র রায়। উপস্থাপন করেন উন্নয়নকর্মী ও সমাজ সংগঠক নজরুল ইসলাম ও রিনা আক্তার।

বারসিক মানিকগঞ্জ অধীন জেন্ডার প্রকল্পের আওতায় গত বছর ২০২০ সালে সিংগাইর উপজেলায় ৯০ জন বিভিন্ন স্তরের অংশগ্রহণকারীর প্রশ্নমালা ভিত্তিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে করোনা কালিন ঘরে বাইরে নারীর অবস্থা ও অবস্থান বিষয়ক একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। প্রশ্নমালার একটি প্রশ্ন ছিল করোনাকালে নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, বিবাহবিচ্ছেদ, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ, যৌতুক, হত্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কি না? উত্তরে অংশগ্রহণকারীর ৭৮% বলেন, বৃদ্ধি পেয়েছে।

কাজী সুফিয়া আক্তার বলেন, নারীদেরকে সাহসী হতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে, টিকটক করে অনেক মেয়ের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। বিদেশে পাচার হযে যাচ্ছে। নারীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানান নিগ্রহের শিকার হন, সেখান থেকে বের হতে হলে তাকে লড়াই করতে হবে, শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। পত্রিকায় আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঘটনার খবর পাই। অনেক ঘটনার বিচার হয়, অনেক ঘটনার বিচার হয় না। আইন থাকার পরও প্রতিকার পাওয়া যায় না, নিজেকে সচেতন থাকতে হবে যে কোন ধরনের প্রলোভন হতে।

রাশেদা আক্তার বলেন, নারীদের বিশেষ করে কিশোরীদের সাথে অনেক বিষযে কাজ করতে গিযে দেখা যায় অনেক ধরনের সমস্যার মধ্যে নারীদের যেতে হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সে ও বিভিন্ন প্রান্তিকতায় নারীর নানান বৈষম্য ও নির্যাতন আছে। আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সভা, মতবিনিময় করে চেষ্টা করে যাচ্ছি কিছু করার। বাল্য বিবাহের অভিশাপ হতে নিজেকে মুক্ত থাকতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি বিভিন্ন হেল্পলাইন ব্যবহার করে আমরা নিজেরা ও অপরকে বাল্যবিবাহ হতে রক্ষা করতে পারি।

বিমল রায বলেন, বারসিক বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নারী পুরুষের সমতা ভিত্তিক, নারীর প্রতি যে কোন বৈষম্য ও নির্যাতনমুক্ত একটি জেন্ডার সমতার সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। নারী পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নির্যাতনমুক্ত হবে এই প্রত্যাশা করছি।

বক্তরা আরো বলেন, বাল্য বিবাহ হতে নারীকে যদি মুক্ত রাখা যায় তবে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। দেখা যায় ১৩ বছরের মেয়ের সাথে ৪০ বছরের বয়স্ক পুরুষের বিয়ের আযোজন করা হয়। বাবা-মা বা অভিভাবকগণ সচেতন না হলে কিভাবে মুক্তি? করোনাকালে স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকায় অনেক বাল্যবিবাহ হচ্ছে। সমাজ বাল্য বিবাহমুক্ত হোক, নির্যাতনমুক্ত হউক এবং নারী পুরুষের সম্প্রীতিতে সমাজ গড়ে উঠুক।

আলোচনা শেষে হরিরামপুরের কিশোরী শিক্ষার্থী ইভা আক্তার একটি গান পরিবেশন করেন।

কড়চা/আর এ বি

Facebook Comments
ভাগ