বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট কেবল উৎপাদনের সমস্যা নয়; এটি জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা, সঞ্চালনব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট ও বিভিন্ন কারিগরি-অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে জাতীয় গ্রিডে চাপ বেড়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি আমরা আগেও দেখেছি। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি অফিসের সময়সূচি সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বর্তমান সময়ে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি বিলম্বিত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে, আবহাওয়াজনিত কারণে এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করবে, জনগণও যদি একই সঙ্গে বিদ্যুতের অপচয় কমায়, তাহলে সংকট মোকাবিলার পথ অনেক সহজ হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানে অন্ধকারে থাকা নয়; বরং প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করা। এতে যেমন পরিবারের বিদ্যুৎ বিল কমবে, তেমনি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে। ফলে শিল্প, কৃষি, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ বাড়বে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি পরিবার, একটি অফিস, একটি দোকান কিংবা একটি প্রতিষ্ঠান একা হয়তো সামান্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে; কিন্তু কোটি মানুষের সম্মিলিত সাশ্রয় জাতীয় পর্যায়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করা, পিক আওয়ারে—বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত—অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
একজন মানুষ হয়তো মনে করতে পারেন, তিনি একটি বাতি বা একটি ফ্যান বন্ধ করলে জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব খুবই সামান্য। কিন্তু কোটি মানুষ একই সময়ে একই ধরনের দায়িত্বশীল আচরণ করলে তার সম্মিলিত প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, একটি বাড়িতে যদি অপ্রয়োজনীয় দুটি বাতি, একটি ফ্যান বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র কিছু সময় বন্ধ রাখা হয়, তাহলে ওই পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে। একই কাজ যদি লাখ লাখ পরিবার করে, তাহলে পিক সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ কমানো সম্ভব।
আলো ব্যবহারে হতে হবে সচেতন
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা। দিনের বেলায় যথাসম্ভব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে। কোনো ঘরে কেউ না থাকলে সেই ঘরের বাতি জ্বালিয়ে রাখা উচিত নয়।
বাড়ি, অফিস, দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ম করা যেতে পারে—“ঘর ছাড়ার আগে আলো বন্ধ করুন।”
এ ছাড়া এলইডি বাতি ব্যবহার করলে একই ধরনের আলোকসজ্জা তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচে পাওয়া যায়।
পিক আওয়ারে কমাতে হবে বিদ্যুতের ব্যবহার
বিদ্যুৎ সংকটের সময় পিক আওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্ধ্যার সময় সাধারণত বাসাবাড়ি, অফিস, দোকান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যায়।
তাই সম্ভব হলে কাপড় ইস্ত্রি করা, ওয়াশিং মেশিন চালানো, পানির পাম্প, বৈদ্যুতিক ওভেনসহ অপেক্ষাকৃত বেশি বিদ্যুৎ-খরচকারী কাজ পিক আওয়ারের বাইরে করা উচিত। সরকারও পিক আওয়ারে বেশি বিদ্যুৎ খরচকারী যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে সংযম জরুরি
গরমের সময়ে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজন ছাড়া এয়ার কন্ডিশনার চালানো উচিত নয়। ঘরের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রেখে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করলে ঠান্ডা ধরে রাখা সহজ হয় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অপচয় কমে।
সরকারের পক্ষ থেকেও এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খালি কক্ষে এয়ার কন্ডিশনার চালু রাখা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
ইনভার্টারযুক্ত এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কমানো সম্ভব। ঘরে কেউ না থাকলে ফ্যান, টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখতে হবে। স্ট্যান্ডবাই অবস্থায় থাকা অনেক যন্ত্রও কিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তাই চার্জার বা অ্যাডাপ্টার প্রয়োজন না থাকলে সকেট থেকে খুলে রাখার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।
ফ্রিজ ও পানির পাম্পেও সাশ্রয় সম্ভব
ফ্রিজ সারাক্ষণ চালু রাখতে হয়। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা উচিত নয়। গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে না দিয়ে উপযুক্ত তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করা উচিত।
পুরোনো ও অদক্ষ বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পরিবর্তে শক্তি-সাশ্রয়ী সরঞ্জাম ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো সম্ভব।
অনেক বাড়িতে পানির পাম্প প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় চালানো হয়। ফলে পানি অপচয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎও অপচয় হয়। পানির ট্যাংক পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাম্প বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কমাতে হবে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা
দোকান, মার্কেট ও শপিং মলে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আলো ব্যবহার করা হয়। সংকটের সময়ে সৌন্দর্যবর্ধক অতিরিক্ত আলোকসজ্জা কমানো যেতে পারে। প্রয়োজনীয় আলো রাখা হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড, ডিসপ্লে ও সাজসজ্জার আলো সীমিত করা হবে। এতে ব্যবসা বন্ধ না করেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সময়সীমা নিয়েও সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের নির্দেশনাসমূহ দেশের জনগণকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
আগামী দুই মাস—সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—সন্ধ্যার পর এয়ার কন্ডিশনারযুক্ত বড় হলরুম ব্যবহার করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা যেতে পারে। একান্ত প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র শুক্র ও শনিবার আয়োজন করা যেতে পারে।
শিল্পকারখানায় বাড়াতে হবে দক্ষতা
শিল্প খাত দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অর্থ শুধু বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করা নয়; একই পরিমাণ উৎপাদন কম বিদ্যুৎ দিয়ে করার চেষ্টা করা।
কারখানায় পুরোনো মোটর, পাম্প ও আলোর ব্যবস্থা পরিবর্তন করে দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় মেশিন বন্ধ রাখা এবং সম্ভব হলে উচ্চ বিদ্যুৎ-চাহিদার কাজ পিক আওয়ারের বাইরে করা যেতে পারে।
অফিসেও গড়ে তুলতে হবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সংস্কৃতি
অফিসে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অফিস ছুটির সময় কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার ও আলো বন্ধ আছে কি না, তা নিশ্চিত করা উচিত।
প্রতিটি অফিসে একজন বা একটি ছোট দলকে “এনার্জি মনিটর” হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এনার্জি মনিটর অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।
ছোটবেলা থেকেই তৈরি করতে হবে সচেতনতা
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মাদরাসা, কমিউনিটি সেন্টার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—বিদ্যুৎ অপচয় করা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি জাতীয় সম্পদেরও অপচয়।
বাড়াতে হবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার
যেখানে বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী, সেখানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের কিছু বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
তবে সৌরবিদ্যুৎকে রাতারাতি জাতীয় গ্রিডের বিকল্প হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করতে হবে
বিদ্যুৎ চুরি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং সৎ গ্রাহকদের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়ায়। জনগণকে বিদ্যুৎ চুরি বা অবৈধ সংযোগ থেকে বিরত থাকতে হবে। কোথাও অনিয়ম দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে আইনসম্মতভাবে অভিযোগ করা উচিত।
প্রয়োজন ধারাবাহিক জনসচেতনতা
টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়ে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো দরকার। শুধু সংকটের সময় নয়, সারা বছর “বিদ্যুৎ বাঁচান, দেশ বাঁচান” ধরনের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের দায়িত্ব হলো পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত সম্পন্ন করা, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো।
অন্যদিকে জনগণের দায়িত্ব হলো অপ্রয়োজনীয় চাহিদা কমানো, পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা এবং বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করা।
অর্থাৎ সমাধানের সূত্রটি হতে পারে—সরকার সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, আর জনগণ চাহিদার অপচয় কমাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়কে শুধু সরকারি নির্দেশ হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে জাতীয় দায়িত্বে পরিণত করতে হবে।
আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—
“অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নয়, অপচয় নয়; প্রয়োজনমতো বিদ্যুৎ ব্যবহার করব, জাতীয় সম্পদ রক্ষা করব।”
লেখক: প্রকৌশলী মোঃ জাকির হোসেন, ফেলো, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ
যুগ্ম আহ্বায়ক, জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটি
















