কন্যাশিশু দিবসে কন্যাদের প্রত্যয়

রাশেদা আক্তার : “আমরা কন্যাশিশু-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হবো, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বো” প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের পূর্ব মকিমপুর গ্রামে কিশোরীদের উদ্যোগে এবং বারসিক এর সহযোগিতায় পালিত হলো আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২১। দিবসকে কেন্দ্র করে বাল্যবিবাহ রোধ, কন্যাশিশুর প্রতি সকল ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্য প্রতিরোধে আলোচনা সভা এবং মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

কিশোরী সামিয়া আক্তারের সভাপতিত্বে আলোচনার শুরুতেই দিবসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রবন্ধ পাঠ করে কিশোরী খাদিজা আক্তার। এতে উল্লেখ করা হয়, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ রাষ্ট্রসমূহ প্রতি বছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ২০১২ সাল থেকে। এই দিবসটি মেয়েদের দিনও বলা হয়। শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনী সহায়তা ও ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক তথা বাল্যবিবাহ। কানাডা ভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্লান ইন্টারন্যাশনাল “কারণ আমি একজন মেয়ে” (Because I am a girl) এই নামে কন্যা শিশু দিবস উদযাপনের প্রস্তাবনা উত্থাপন করে। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর তারিখে এই প্রস্তাব রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় গৃহীত হয় ও ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর তারিখে প্রথম আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়।

কন্যাশিশুদের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, বারসিক জেন্ডার সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকল্পে ছাত্র-যুব শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম করে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনগত সহায়তা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে সচেতনতা ও সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ বা নিজেদের সুরক্ষা যাতে নিজেরা করতে পারে সেই জন্য স্কুল ও গ্রাম পর্যায়ে কিশোরী ও জনসংগঠন গঠনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানী ও বয়:সন্ধিকালের বিষয়সমূহ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে। আমাদের সকলের হাতেই এখন স্মার্ট ফোন আছে। এই প্রযুক্তির খারাপ ভালো দুই দিকই আছে। আমাদের নিজেদের ঠিক করতে হবে আমরা কি খারাপ দিক বেছে নিব নাকি ভালো দিক বেছে নিব। আমরা অবশ্যই ভাল দিক বেছে নিব। কন্যাশিশুদের কন্ঠকে জোরালো করতে হবে। নিজেদের সমস্যার কথা নিজেকে বলতে হবে। এর জন্য সবাইকে কথা বলতে হবে। আজ এখানে কন্যারা মিলে এই কর্মসূচির আয়োজন করেছো। তোমরা সংগঠন করেছ তোমাদের উদ্যোগ সফল হোক, কন্যাদের জয় হোক।

“আমরা কিশোরী বাল্যবিবাহ করবো না, কন্যাদের নির্যাতিত হতে দেব না” স্লোগানকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে কিশোরীরা বাল্যবিবাহরোধসহ কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে “একতা কিশোরী সংগঠন” নামে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট সংগঠন গঠন করে। এ সময় কিশোরী সামিয়া আক্তারকে সভাপতি করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।

নব গঠিত সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া আক্তার বলে, আগে তো জানতামই না আমাদের জন্যও দিবস আছে। আজ এখানে এসে জানলাম। আমরা সবাই মিলে সংগঠন করলাম। আমার খুব ভাল লেগেছে।

কিশোরী মলি আক্তার বলে, আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এখানে এসে অনেক কিছু জানলাম। আমরা এক ভাই এক বোন। আমার মা-বাবা আমাকে কোনো কিছুতেই বাধা দেয়না। সব খানে যেতে দেয়। কিন্তু বেশির ভাগ মা-বাবাই তাদের ছেলে-মেয়েদের আলাদা ভাবে দেখে। মেয়েদের কোথাও যেতে দিতে চায়না। সব মা-বাবার উচিত তাদের ছেলে-মেয়েদের সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া।

কিশোরী খাদিজা আক্তার বলে, আজ কন্যাশিশু দিবস। মেয়েরা বিভিন্ন ভাবেই অবহেলিত। কোথাও যাওয়া যাবে না, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবেনা । সব কিছুতেই না আর না। কিন্তু মেয়েরাও অনেক কিছু পারে। তাদের সুযোগ দিতে হবে। আমরা অবহেলা চাইনা। আমরা সমান সুযোগ চাই।

আলোচনা সভায় নব গঠিত সংগঠনের সভাপতি সামিয়া আক্তার বলে, আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। আমাদের আশে-পাশে সব সময়ই বাল্যবিবাহ হচ্ছে। ফলে তারা অনেক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মেয়েদের সব ক্ষেত্রেই অবহেলা করা হয়। খাবারের ক্ষেত্রে অবহেলা করে, কিছু কিনে দিতে গেলে অবহেলা করে। মেয়েরা কিছু করলে আশে-পাশের লোক কি বলবে সেটা ভাবে। যার জন্য আমরা কিছু করতে পারিনা। এর শিকার হচ্ছে আমাদের মত মেয়েরো। আমরা সংগঠন করেছি, ভাল কিছু করতে চাই। বাল্যবিবাহ রোধ করতে চাই সকলে মিলে।

আলোচনা সভা শেষে কিশোরীদের অংশগ্রহণে মানববন্ধন করা হয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানী, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধসহ কন্যাশিশুদের প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য প্রতিরোধে সকলে এক সাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

কড়চা/ আর এ

Facebook Comments
ভাগ