জন্মদিনের শপথ করতে চাই মানব সেবা/ রুহুল ইসলাম টিপু

জন্মদিনের শপথ করতে চাই মানব সেবা
রুহুল ইসলাম টিপু

আমার জন্মদিন ১৩ অক্টোবর ১৯৬৬। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। ক্লান্ত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসি আসি করছে এমন সময়। আট মাসেই বের হয়ে পড়ি মা’য়ের গর্ভ হতে। আমাকে বলা হলো আঠাসে। পৃথিবী দেখার বেশ ত্বরা ছিল। বড় এক বোন। নাম টুকটুক। বাবা মা তখন মানিকগঞ্জ শহরে অধ্যাপক বাবুল কাকা’দের বাড়িতে থাকতেন। চার বছর বয়সে আমার আপা টুকটুক মারা যান। এরপর আমি। বেশ রোগাক্রান্ত ছিলাম। হাঁটা শিখতেও দেরি হয়। বাঁচিয়ে রাখতে বাবা মা ডাক্তার কবিরাজ মসজিদ মন্দির সংস্কার সব কিছুর পরশ দিয়েছেন আমার শরীরে। আমার ডান কানে একটি ছিদ্র আছে। শৈশবে এ নিয়ে বিচিত্র কটু উক্তি জুটতো। সুযোগ হলেই হাত বুলাই। বড় মায়া এবং ভালোবাসা এর মধ্যে লুক্কায়িত। বাড়িতে আলমারীতে আমার বোনের কাপড় চোপড়। মা’কে দেখেছি সেসব নেড়ে চেড়ে দেখতে। আর নিরবে চোখের জল ফেলতে। বাবা’র তিনটি টাঙ্ক ছিল। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। গোপনে টাঙ্ক খুলে বাবা’র হাতে লিখা ডায়েরি পড়ি। সেথায় লেখা আমাদের ভাই বোনের জন্ম তারিখ সময়। প্রেক্ষাপট বাবা’র অনুভূতি এসব। অন্য কিছু মনে নেই। তবে আমার জন্ম তারিখ মাথায় প্রবেশ করে। একটি পৃথক ডায়েরিতে দেখি বাবা বেশ বড় একটি গল্প লিখেছেন। হয়ত উপন্যাস বা বড় কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল। পড়েছি লুকিয়ে লুকিয়ে। বাবা’র এ হারানো ডায়েরি’র জন্য আমি বেশ কষ্ট অনুভব করি। আমার সামান্য লেখার অভ্যাস। এটি আমি বাবা’র নিকট হতে পেয়েছি। স্কুলে প্রদান করা তারিখের সাথে হাতে লেখা জন্মতারিখের মধ্যে বেশ বিস্তর ফারাক। শুনেছিলাম চাকুরি প্রাপ্তিতে কাজে লাগবে। সরকারি চাকুরি’তে আমার আগ্রহ জন্মায়নি। তাই বিস্তর ফাঁকা সময়কে কোন কাজে লাগাতে পারিনি। বরং সনদ এবং বাস্তব জন্মতারিখের অমিল আমাকে পীড়া দিয়েছে। আমি মিথ্যে তথ্য দিচ্ছি। এটি আমাকে মিথ্যেবাদী করেছে। ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে আমি জন্ম-তথ্য বিভ্রাট ঘটাইনি। নীতি নৈতিকতার প্রধান ভিত্তি। আমার দু’টি জন্মদিন থাকবে। এ কেমন কথা। জীবনের যাত্রা হবে জন্ম-বিভ্রাট তথ্য দিয়ে। নিজেকে প্রতারক করে সত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

সে সময় জন্মদিন পালন উৎসবের রেওয়াজ তেমন ছিল না। সরকারি কোয়াটারে থাকতাম। আমাদের পাশের বিল্ডিং ছিল ম্যাজিস্ট্রেট এবং উর্ধতন কর্মকর্তাদের বাসভবন। একটি একতলা বাড়ি। দ’ুটি বড় বড় ফ্ল্যাট। স্কুলে পড়ার সময় মা ও পড়শি খালাম্মাদের হাত ধরে বড় ফ্ল্যাটে যাওয়া হতো। তাঁদের ছেলেমেয়েদের জন্মদিনের কেক কাটা উৎসবে। দেখেছি ঘর রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো। কেকে’র সাথে চানাচুর, মিষ্টি, হাতে বানানো পিঠা, কলা, ফল, উপাদেয় খাবার ছোট ছোট প্লেটে করে আমাদের পরিবেশন করতো। কিছু সময় সকলে মিলে আনন্দ উদযাপন উপভোগ করি। বাবা মা’কে বলেছিলাম ওদের জন্মদিন পালন করা হয়। আমাদের কেন হয় না। এরপর মা জন্মদিনে ক্ষির রেধে খাওয়াতেন। তবে ঘটা করে আয়োজনের মধ্য দিয়ে নয়। নিজেদের মধ্যে। সকল বর্ষে সব জন্মদিনে হতো এমন নয়। একটু বেশি রান্না করা হতো। পিরিচে পিরিচে প্রতিবেশিদের বাড়িতে পৌছে দিতাম আমরা তিন ভাই। বলতাম আজ আমার জন্মদিন। লিপু এবং ইপু আমার দুই ভাইও বলতো। আজ আমার জন্মদিন। খালাম্মা বড় আপা এবং ভাইয়া’রা বলতেন তোমরা তিনভাই একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছো। সবাই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতাম। তাইতো মা ক্ষির রান্না করেছেন। আপনাদের জন্যও পাঠিয়েছেন। স্মৃতিময় অতীত বড়ই আবেগ আপ্লুতময়।

আমার ছিল পত্রমিতালীতে ভরপুর বন্ধু বান্ধব। চিঠি’র বন্ধুদের শব্দ ভাষায় দেখতে পেতাম। শত হাজার মাইল দূর থেকে শব্দ বাক্য দিয়ে নর-নারীকে জানা চেনা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়ার মজাই আলাদা। বন্ধুরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠাতো। উপহারও থাকতো। বই পেতাম। পড়ে কার্ড এর প্রচলন এলো। জন্মদিন’কে মনে করিয়ে দিতো কিছু চিঠি। ১৩ অক্টোবরের বেশ পূর্বেই পেতাম সেসব চিঠি। এতে এক দুই সপ্তাহ পূর্ব হতেই জন্মদিন জাগানিয়ার রূপ ধারণ করতো। মা’কে হয়ত বায়নাও ধরতাম ভিন্ন কিছু রান্না করার জন্য। খুব যে দিবসকে আলাদাভাবে উপভোগ করা হতো। তা নয়। তবে আমার জন্মদিন আসে যায়। আমাকে দোলা দিয়ে। সফলতা এবং না পাওয়ার হিসেবটি করা হয় এদিন। ছাত্রজীবনে জন্মদিনে কত পণ করেছি। জীবনের একটি বছর পার করে আবার নতুন বর্ষে পদার্পণ। এবার দেখিয়ে দিবো পড়াশুনায় প্রথম হবোই। নিজেকে মূল্যায়ন করে দেখি যা ছিলাম তা-ই আছি। কোন পরিবর্তন নেই।

১৯৯৫ সালে বিয়ে। জন্মদিনের ৫ দিন পূর্বে তারিখ ছিল ০৮ অক্টোবর। সে বছর জন্মদিন আমাকে ভিন্ন আমেজ উপহার দিলো। আমার সাথে যুক্ত হলো প্রিয়তমা স্ত্রী। এদিন আমি স্ত্রীকে উপহার দিলাম ছবির অ্যালবাম সেখানে ছিল ৫ শত আমার ছবি। সাথে ১ শত অডিও ক্যাসেট। আমার প্রিয় গান। তুমি ছবি দেখবে আর গান শুনবে। আমি অফিসে। তোমার সময় কাটবে আমাকে ভেবে ভেবে। অডিও ক্যাসেটের অস্তিত্ব এখন বিলীন। সে অ্যালবামের ছবিও ক্রমে সংখ্যা হারিয়ে শ্রী আর ধরে রাখতে পারেনি। এখন তো সফ্ট কপি। গান চলে এসেছে ইউটিউবে। জন্মদিন ভালোলাগা ভালোবাসা সব কিছু ডিভাইস নির্ভর।

কর্মস্থলে ২০১৫ সালে গোপনে আমার জন্মদিনের আয়োজন করা হয়েছিল। কাজে ব্যস্ত থাকায় আঁচ করতে পারিনি। সেদিন সারাদিন বেশ বৃষ্টি ছিল। অঝোড়ে পৃথিবী কাঁদছে। বাইরে বের হওয়ার অবস্থা ছিল না। অফিস কর্ম তাই একাধিকবার ভিজতে হলো। সহকর্মীদের পরিকল্পনা ছিল অফিসের শেষ সময়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবে। এরপর বিকেলের নাস্তা। ঠিক এর পূর্ব মুহূর্তে একটি ফোনকল সব উলট পালট করলো। স্ত্রী’র ফোন। ছোট ভাই জাতীয় ফুটবলার মাসুম আর নেই। বাসায় চলে আসো। মানিকগঞ্জ যাবো। আমার জন্মদিন রূপ নিলো ভাইয়ের মৃত্যু দিবসে। তিনদিন পর জন্মদিনের ফুলের তোড়া এলো আমার হাতে। তবে জন্মদিনের হাসিমাখা স্মৃতি নিয়ে নয়। সোহেল আল মাসুম হারানো কান্নামিশ্রিত বেদনাকে আজীবন সাথী করে।

আমার নেশা কড়চা’য় লেখা। জন্মদিন নিয়ে লিখবো এক সপ্তাহ যাবৎ এটি আমার ভাবনায় রয়েছে। গতকাল অফিস ত্যাগ করি একঘন্টা পূর্বে। রাতে দুটি মিটিংও ছিল। একটি প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম। আমি ফোরাম এর ভাইস চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীর বিজয়োৎসব উদযাপন। ফেসবুক পেজ এ ক্লিক করতেই সব এলো মেলো। কিরণ্ময় মন্ডল দাদা লিখেন আজ একটা তারার নাম দিলাম কষ্ট! ভালো থাকিস! আমার মা’র জন্য প্রার্থনা করবেন যেন কনিষ্ঠ পুত্র সন্তানের শোক বহন করতে পারেন! অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু ভাই লিখেন, মৃম্ময় মন্ডল টুংকু। আপন ভাইয়ের মত সম্পর্ক ছিল ওর সাথে। দেখতে রাজপুত্রের মত। মাত্র দু বছর আগে চল্লিশ পূর্ণ করা আমাদের টুংকু হুট করেই না ফেরার দেশে চলে গেল। বন্ধু ডাক্তার সুব্রত ফোন করল। কিছুই শুনতে পেলাম না। শুধু বুঝতে পারি সুব্রত কাঁদছে। ভাই হারানোর কান্না। শোকের মাতম। কড়চা’য় আমার একটি লেখার শিরোনাম অনন্তধ্বনি প্যারিস এবং আমার দাদা কিরণ্ময় মন্ডল। সেথার একটি লাইন, ‘এই পরিবারের সাত ভাই-ই মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের ছাত্র।’ সাত যে ছয় হলো। এ বেদনা রাখি কোথায়। গত রোজার ঈদের পূর্বদিন সন্ধ্যায় কড়চা সম্পাদক সুরুয খান এর অফিসে যাই। বেশ কিছু সময় দাড়িয়ে ছিলাম শান্তি ফার্মেসী’র সামনে। টুংকু হাসছে। ঔষধ দিচ্ছে। ছোট ছোট বাক্যে বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। এই আমার দেখা টুংকু। আমি কিছুই লিখতে পারিনি ১২ তারিখ রাতে। আজ আমার জন্মদিন ১৩ অক্টোবর ২০২১ সকালে উঠে শুধুই রেখে দিলাম আমার লেখার শিরোনাম জন্মদিনের শপথ করতে চাই মানব সেবা।

কড়চা/ এস কে

Facebook Comments
ভাগ