ভালোবাসার বিজ্ঞান : সুরুয খান

ভালোবাসার বিজ্ঞান

সুরুয খান

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। চারপাশে লাল গোলাপের হাসি, রঙিন কার্ডের নীরব ভাষা, চোখে চোখে জমে থাকা অপ্রকাশিত কথা। এই দিন এলেই বারবার ফিরে আসে সেই চিরচেনা প্রশ্ন- ভালোবাসা আসলে কী? এটি কি কেবল হৃদয়ের আবেগ, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের সুক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ?

প্রথম দেখায় ভালোবাসাকে মনে হয় নিখাদ হৃদয়ের বিষয়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, হৃদয় নয়- ভালোবাসার আসল বাস মস্তিষ্কে। আবেগের আড়ালে সক্রিয় থাকে হরমোন, রাসায়নিক সংকেত আর বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। বিবর্তন, জীববিজ্ঞান ও রসায়ন- এই তিন শক্ত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসা নামের এই আশ্চর্য অনুভূতি।

আজ থেকে প্রায় চল্লিশ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সমভূমিতে আদিম মানব-মানবীর মস্তিষ্কে প্রথম এক বিশেষ নিউরোকেমিক্যালের ক্ষরণ ঘটে। তারই প্রভাবে একে অন্যের চোখের দিকে তাকাতে গিয়ে কেঁপে ওঠে মন, ঘেমে ওঠে হাতের পাতা- জন্ম নেয় প্রথম প্রেম। মানুষ যখন চার পায়ে হাঁটা ছেড়ে বিবর্তনের পথে দুই পায়ে দাঁড়াল, তখন প্রথমবার তারা একে অন্যকে দেখল স্পষ্টভাবে। চোখের রঙ, কাঁধের প্রস্থ, শরীরের গড়ন- সব ভিন্নতা ধরা পড়ল দৃষ্টিতে। আদিম মানুষ উপলব্ধি করল, প্রত্যেকেই আলাদা, প্রত্যেকেই নিজের মতো করে সুন্দর। ক্রমে বিবর্তন ঘটল মানুষের যৌন জীবনেও। যৌন মিলন তখন আর শুধু বংশবৃদ্ধির মাধ্যম রইল না, এর সঙ্গে যুক্ত হলো সুখের এক সূক্ষ্ম অনুভব। বাকি জীবজগতের মতো মানুষও একসময় পিছন দিক থেকেই সম্ভোগ করত। কিন্তু বিবর্তনের স্রোতে আদিম মানব-মানবী ঘুরে দাঁড়াল একে অন্যের মুখোমুখি। সামনে থেকে সম্ভোগ শুরু হলো, আর সেখানেই মানুষ আলাদা হয়ে গেল অন্য সব জীবের থেকে।

বিবর্তনবাদীদের মতে, প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স ছিল আফ্রিকার এক কোণে বসবাসকারী সাধারণ এক প্রাণী। খাদ্য সংগ্রহেই ছিল তাদের প্রধান ব্যস্ততা। অথচ সময়ের স্রোতে তারাই হয়ে উঠল সমগ্র পৃথিবীর অধিকারী। একসময় এই পৃথিবীতে অন্তত ছয়টি মানব প্রজাতি বসবাস করত, আজ টিকে আছে মাত্র একটি- আমরা।

অনেক বিবর্তনবাদী মনস্তাত্ত্বিকের মতে, আদিম সমাজে একগামী দম্পতির ধারণা ছিল না। পিতৃত্বের স্পষ্ট দাবি তখন অনুপস্থিত। একজন নারী একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারত, আর গোত্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক মিলেই শিশুদের লালন-পালন করত। যেহেতু কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না কোনটি কার সন্তান, তাই সবাই সমানভাবে শিশুদের যত্ন নিত। তখনকার বিশ্বাস অনুযায়ী, একটি শিশু কেবল একজনের নয়, বরং একাধিক পুরুষের অংশগ্রহণে জন্ম নেয়। আজকের বিজ্ঞানের আলোকে এ ধারণা অদ্ভুত শোনালেও, আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের আগে মানুষের কাছে ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ ছিল না।
এই ‘প্রাচীন কমিউন’ তত্ত্বের প্রবক্তারা মনে করেন, সেই বহুগামী সামাজিক কাঠামোর প্রভাবই আজকের বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের উচ্চ হারের পেছনে কাজ করছে। অবশ্য বহু পণ্ডিত এই তত্ত্বের বিরোধিতা করে বলেন, একগামিতা ও দম্পতি-কেন্দ্রিক পরিবার গঠন মানুষের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
ভালোবাসার অনুভূতি কেমন? গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৯ শতাংশ প্রেমিক-প্রেমিকা একে ‘জোয়ারে ভেসে যাওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেন। এটি কেবল কাব্যিক উপমা নয়, আক্ষরিক অর্থেই তখন শরীর ভেসে যায় জৈব-রাসায়নিকের এক প্রবল জোয়ারে।

চোখে চোখ পড়া, বা হালকা হাতে হাত ছোঁয়া- এই সামান্য মুহূর্তগুলোই মস্তিষ্কে রাসায়নিক বন্যার সূচনা করে। স্নায়ুতন্ত্র হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। রক্তের প্রবাহ বাড়ে, ঘেমে ওঠে হাত, দ্রুত হয় শ্বাস। আশ্চর্য হলেও সত্য, ভালোবাসা আর উৎকণ্ঠার বাহ্যিক প্রকাশ প্রায় একই- কারণ দুটির নেপথ্যে কাজ করা রাসায়নিকও প্রায় একরকম।

ভালোবাসার সময় যে অকারণ আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তার জন্য দায়ী অ্যামফেটামিন গোত্রের কিছু রাসায়নিক- ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন ও ফিনাইল ইথাইল অ্যামিন বা পি.ই.এ। তাই কেউ যদি বলেন, “তোমাকে দেখে নেশা ধরে যাচ্ছে”- তাকে নিছক ফিল্মি সংলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বৈজ্ঞানিকভাবে ভালোবাসা সত্যিই একধরনের পি.ই.এ-নেশা।

তবে এই নেশা চিরস্থায়ী নয়। অন্যান্য নেশার মতোই শরীর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। দু-তিন বছরের মধ্যে পি.ই.এ-র প্রতি টলারেন্স তৈরি হয়, ফলে ভালোবাসার তীব্রতা কমে আসে। অনেকেই এই পরিবর্তন মেনে নিতে না পেরে এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্কে ছুটে বেড়ান।

তবুও বহু ভালোবাসা টিকে থাকে উন্মত্ততার পরের স্তরেও। এর পেছনে কাজ করে এন্ডোরফিন নামের আরেক শ্রেণির রাসায়নিক। সঙ্গীর নিয়মিত উপস্থিতিতে এই রাসায়নিক মস্তিষ্কে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতি এনে দেয়। এন্ডোরফিন আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটায় না, বরং গভীর প্রশান্তি দেয়। তাই দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে ভালোবাসা হয় শান্ত নদীর মতো, নিঃশব্দ কিন্তু গভীর।

ভালোবাসার আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক হলো অক্সিটোসিন। এই হরমোন নারীর প্রসব, দুগ্ধ উৎপাদন, সন্তানস্নেহ এবং পারস্পরিক আদরের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। গবেষণায় দেখা গেছে আদর, স্পর্শ এবং দেহমিলনের সময় অক্সিটোসিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার ফলে দু’জন মানুষের মাঝে এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন তৈরি হয়। এ বন্ধন গড়ে তোলে এন্ডোরফিন ও অক্সিটোসিন। কম বয়সে ভালোবাসা হয় উত্তাল, বয়স বাড়লে তা হয় স্থিত, সহনশীল। এন্ডোরফিন মানুষকে শেখায় কীভাবে একে অন্যের ভুলত্রুটি মেনে নিয়ে পাশাপাশি থাকা যায়।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাকিবুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভালোবাসায় জড়ালে বা কাউকে মনেপ্রাণে ভালোবাসলে এক কথায় প্রেমে পড়লে ব্রেন থেকে পিরোটনিন হরমোন নিঃসরিত হয়। ফলে কাজকর্মে সতেজতা পাওয়া যায়। এ কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভালোবাসা জরুরি।

সবশেষ গবেষণা বলছে, ভালোবাসার প্রধান অঙ্গ মস্তিষ্ক- হৃদয় নয়। তবু মানুষ বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে ভালোবাসার কথা বলে। কারণ বিজ্ঞান যতই বিশ্লেষণ করুক, ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত অনুভবের বিষয়।
ভালোবাসা দিবসের ইতিহাসও কম রোমান্টিক নয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন একজন ধর্মযাজক ও চিকিৎসক। রোমান শাসকদের রোষানলে পড়ে কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। সেখানেই জন্ম নেয় প্রেম। মৃত্যুর আগে এক চিঠিতে তিনি লিখে যান তাঁর ভালোবাসার কথা। সেই স্মৃতিতেই ১৪ ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে ভালোবাসার দিন।

এই দিনে তাই বিজ্ঞান ও অনুভূতি একে অন্যের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। ভালোবাসা থাকুক যুক্তিতে দৃঢ়, অনুভবে মানবিক।

কড়চা/এস কে

Facebook Comments Box