পথ চা বিক্রেতা একজন হকার হারু দাস (হারু মামা)

নজরুল ইসলাম : ‘হাটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়, পারিবে না বলে মুখ করিও না ভার’ জগত সংসারে কিছু মানুষের জীবন জন্ম থেকেই সংগ্রামময়, কন্টকাকীর্ন বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করেই তাকে পথ চলতে হয়। পশ্চাতপদ তথা প্রান্তিক শ্রেণির অধিকাংশ মানুষই সংগ্রামের সিরি বেয়ে উপরে উঠতে চায়। অন্যদিকে সমাজ ও রাস্ট্র তাদেরকে সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের মূলধারায় প্রবেশের কল্পলোকের গল্প শোনায় যাতে তারা অধিকারের জন্য শ্রেণি সংগ্রাম করতে না পারে। গণবিস্ফোরন ও গণপ্রতিরোধকে সামাল দিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর নামে কোনরকম গালে পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে পিছিয়ে পরা হতদরিদ্র মানুষদেরকে। তাই পিছিয়ে পরা শ্রেণির সাথে এগুলো এক ধরনের তামাশা ছারা আর কিছু্ই নয়।

সমাজে অসংখ্য শোষিত বঞ্চিত নিপিরীত মানুষের মধ্যে হারু মামাও একজন। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যমতে মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন গঙ্গাধরপট্টির মতো অভিজাত এলাকার আবর্জনার পুকুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় তার অবস্থান। নাম তার হারু দাস (৪৪)। পিতা মৃত মহাদেব দাস, মাতা মৃত রাধা রাণী দাস, স্ত্রী বেবী রাণী দাস। দুই পুত্র সন্তানের জনক। হারু মামার কথা বলে শেষ করা যাবে না। তারপরও তাকে নিয়ে একটু বলতে চাই।

আমি ছাত্র জীবন থেকেই বিশেষ করে দেবেন্দ্র কলেজে পড়া অবস্থায় হারু মামাকে দেখি তিনি কলেজে ছাত্র–শিক্ষক সবাইকে ডেকে ডেকে চা পান করতে আহ্বান করতেন আর বলতেন ‘চা গরম, চা গরম’। অন্যদিকে শিক্ষার্থ ীরাও তাকে চা খাওয়ানের জন্য চারদিক থেকে মামা বলেই ডাকতো। আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে হারু মামাকে যেভাবে হাসিখুশি দেখেছি এখন সেরকম নেই। শারিরিক ভাবেও তিনি অসুস্থ হলেও গালভরে তার মামা ডাক এখনো আমার কানে বাজে। তাই মাঝে মাঝে ডাক শুনলে থাকতে পারি না, থমকে দাড়াই। মনটাও আনন্দে ভরপুর হয়। এরর্ই মাঝে বৈশ্বিক মহামারী করোনকাল দীর্ঘায়িত হওয়াতে হারুমামাদের জীবনকাল ছোট হয়ে আসছে। সংকট আরো ঘনিভূত হচ্ছে। হারু মামার জন্য কি করতে পারি মনে মনে ভাবি আর নিজের সামর্থ্যের সাথে আরো সাথী খুজি যোগ করার জন্য। ভূমিহীন হারু মামাদের হকার ও যাযাবর জীবনের গ্লানি কাটিয়ে সরকারের চলমান উন্নয়নের মূলধারায় প্রবেশাধিকারের জন্য তাদের জীবন সংগ্রাম সমাজ ও রাষ্ট্রের মাঝে তুলে ধরাও প্রয়োজন বলে মনে করি। এই দায়বদ্ধতা থেকেই কয়েক দফা তার নীরে আসা এবং তাকে গভিরভাবে জানা।

প্রকৃতই একজন পথ চা বিক্রেতা হারু দাস বলেন, আমার জন্ম কোথায় হয়েছে সেটিও আমি জানি না। তবে ছোট বেলা থেকেই বড় হয়েছি মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন বরাই নবগ্রাম শাহাব উদ্দিন খন্দকারের বাড়িতে। আমি জানতাম এটিই আমাদের আসল বাড়ি। কিন্তু যখন জানলাম এটি আমাদের নয়, কেবল খন্দকার সাহেব আমাদেরকে থাকতে দিয়েছেন, আমাদেরকে কামাই রোজগার করে একটি বাড়ি করতে হবে। তখন খুবই কষ্টমনে মায়ের সাথে শক্ত হাতে সংগ্রাম শুরু করলাম। ছোটবেলায় বাবা মারা যান। নানা-নানীর চেহারা দেখি নাই। মা এর কোলে চরেই বরাই নবগ্রামের প্রকৃতি দেখে বড় হয়েছি। আবার মায়ের মুখেই শুনেছি যে আমমাদের বাবদদার আসল ঠিকানা হরিরামপুর পদ্মার চরে, কোন কালে সেটি বিলিন হয়েছে তার হদিস নাই। যাহোক ছোটবেলায় আমি খুবই ডানপিটে ছিলাম। লেখাপড়ায় আগ্রহ থাকলেও চরম দারিদ্র্যতা ডিঙিয়ে পড়ার ঘরে বসতে পারি নাই। মা সারাদিন বাসা বাড়িতে কাজ, সবজিপাতা সংগ্রহ করে মানিকগঞ্জ বাজারে বিক্রি করতেন। আমি সারাদিন মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজসহ বিভিন্ন মাঠে ঘাটে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করি। চা তৈরির পেছনের কাজগুলো আমার স্ত্রী রেবা দাস ঘরে বসেই সহযোগিতা করেন। কামাই রোজগার যতটুক করছি সেটি দিয়ে কোনমতে দুই বেলা খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত চললেও কোন সঞ্চয় করতে পারছি না। কিস্তির ঘরে সঞ্চয় করলেও প্রয়োজনেই ওঠাতে হয়। দুটি ছেলে বড় হয়ে গেলো, এখনো মাথাগুজার ঠাই করতে পারলাম না। স্ত্রী পুত্রের কাছে এর চেয়ে অপমানজনক আর কিছু হইতে পারে না।

তিনি বলেন, তবুও পথে ঘাটে চা বিক্রি করে একভাবে জীবন ভালোই চলছিলো। এরই মাঝে হঠাৎ আমার মাতৃবিয়োগ হলো, এটি আমি মেনে নিতে পারছিনা। জীবন আকাশে আমার বটগাছ আমার মা সেটিও ভেঙে পড়লোা। তারপরও চরম আহত মনে রুটিরুজির সংগ্রাম করছি। আরো কষ্টের কথা হলো গত বছর মার্চ মাস থেকে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় আমিও একেবারেই অন্ধ হয়েছি। অর্থনৈতিক চিন্তায় রাতে ঘুম হয়না। তাই মানসিক রোগী থেকে শারীরিকভাবে বিছানায় পরে গেলাম। বাধ্য হয়ে আমার স্ত্রী পরের বাড়ি কাজ শুরু করলো এবং বড় ছেলেকে একটি শীলের দোকানে কাজ শিখতে দিলেও আমার কিছুই করার ছিলো না। প্রতিযোগিতার বাজারে সব কিছুর দাম বেশি। যতই কষ্ট করি মাথা গুজার ঠাই করতে পারছি না। সমাজে দশজন মানুষ আমাকে চিনে জানে, কিন্তু এই ব্যাপারে কেউ এগিয়ে আসেনা। টিভিতে একদিন দেখলাম যে সরকার কোন মানুষকে রাস্তায় রাখবে না। সকল ভূমিহীনদেরকে জায়গা ও ঘর দিবে এবং লোকমুখেও তাই শুনি। তারপর পৌরসভায় দরখাস্ত করলাম। ভূমিহীন সনদ নিয়ে ঘরের জন্য আবেদন করলাম। সেটিও বছর তিনেক হলো। এর মাঝে দুই বার করে আমাদের নাম ঠিকানা যাচাই করেছে বুকের মধ্যে কাগজ ধরে ছবি তুলেছে এবং জায়গা ও ঘর দেয়ার আশার কথা শুনিয়েছেন কর্তাব্যক্তিরা। গত কয়েকদিন হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্য ভূমিহীনদের মাঝে সরকার সারাদেশে লক্ষাধিক ঘর বিতরণ করলেন এবং বছরব্যাাপি আরো করবে এটি খবরে দেখে আরো বিচলিত হলোম। মনে হয় এ যাত্রায় আর মিছ যাবে না, ঠিকানা আমার হবেই। আসলাম কাউন্সিলরের কাছে। কইলাম সব কখা। তিনি বলেন, এই পর্বে তালিকায় তোমার নাম নেই, তবে পরের যাত্রায় আশা করি হবেই। খুবই আশা মনে মনটা ধুকধুক করছে। আমাকে মানিকগঞ্জ জেলার যে কোন জায়গায় একটু মাথা গুজার ঠাই করে দিলে সবজায়গায় যেতে রাজি ও সবসময় প্রস্তুত আছি। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন আমার ঘর বাড়ি, পয়সা পাতি কিছুই নাই। তাই মুজিববর্ষ উপলক্ষে আমাকে এক খন্ড জায়গা দিয়ে ঘর করে দিলে চির কৃতজ্ঞ থাকবো।

সমাজে অসংখ্য হারুমামাদের প্রায় একই ধরনের জবানবন্দি। সংবিধানের আলোকে দেশের মালিক জনগণ। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র হলো দেশের কোন নাগরিক নূন্যতম মৌলিক চাহিদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। বাংলাদেশের বয়স পঞ্চাশ বছর হলেও ধনী দরিদ্র্যের বৈষম্যের মাত্রা হ্রাস না পেয়ে ক্রমশ আরো বৃদ্ভি পাচ্ছে। এটি কোনভাবেই কাম্য নয়। বর্তমান সরকার ভূমিহীনদের জন্য জায়গাসহ ঘর দেয়ার যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে এটি প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সমস্যা হলো প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দলীয় প্রভাবশালীদের দাপট ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়হীনতা এবং দুর্নী তির যোগসাজের কারণে যোগ্য ও প্রাপ্য ভূমিহীনরা বঞ্চিত হচ্ছে। কথায় বলে, তেলে মাথায় তেল বিষয়টি এরকমই। চারদিকে এই ধরনের অনিয়ম রেখে হাত পা বেধে সরকার প্রান্তিক শ্রেণিকে উন্নয়নের মূলধারায় প্রবেশাধিকার দিতে পারবে না। আমারা সুশাসনসহ সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান চাই। হারু মামাদের জন্য এটি ভিক্ষা নয়, ন্যায্য অধিকার। তাই তাদেরও সংগঠিত আওয়াজ চাই। যার মধ্যে দিয়ে একদিন গণতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হবে এবং নারী পুরুষের বৈষম্য হ্রাসসহ সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সুষম বন্টনের মাধ্যমে একটি সামাজিক মালিকানা তাথা সামাজিক ন্যায়তার সমাজ বিনির্ম াণ হবেই।

কড়চা/ এন ই

Facebook Comments
ভাগ