রানা প্লাজা ট্রাজেডি : নিহত এবং আহত শ্রমিক বোন-ভাইদের স্মরণে/ রুহুল ইসলাম টিপু

ভেঙ্গে পড়া রানা প্লাজা

রানা প্লাজা ট্রাজেডি : নিহত এবং আহত শ্রমিক বোন-ভাইদের স্মরণে

রুহুল ইসলাম টিপু

২৪ এপ্রিল ২০১৩ বুধবার। রাত শেষে ভোরের নরম আলো পড়েছে মাটিতে। আলোকিত দেশ। দিনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার উপক্রম। এদিন পৌনে ৯টায় সাভারে ৯ তলা রানা প্লাজা ভবন ধ্বসে পড়ে। এ ভবনে ছিল তৈরি পোশাক কারাখানাসমূহ, একটি ব্যাংক এবং কিছু দোকান। পূর্বদিন ভবনের ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত হওয়ায় নীচতলার দোকানসমূহ এবং ব্যাংক বন্ধ ছিল। উপরের ৮ তলায় ৫টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারীবৃন্দ ভবনে কর্মরত ছিলেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে উপরের ৮টি তলা ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে একতলার উপরে পড়ে। শ্রমিকরা ভবনের প্রতিটি তলার ছাদ এবং মেঝের সাথে লেপটে চেপটে মিশে যান। বাঁচার আকুতিতে ছটফট করেন। অনেক মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে যায় স্বাভাবিক। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশে এবং বিদেশে। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। বিশাল ভবন হতে হাজার হাজার শ্রমিক বোন-ভাইদের উদ্ধার প্রক্রিয়া সহজ কাজ নয়। ৯ তলা ভবন ভেঙ্গে মুচড়ে মাত্র ২ থেকে আড়াই তলায় ঠেকে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার অভিযান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এটি ছিল উচ্চ পর্যায়ের প্রকৌশলগত প্রক্রিয়া। প্রয়োজন ভারী যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলী এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য দক্ষ কর্মীদল। সীমিত সময়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সমন্বিত প্রক্রিয়ায় সফলতা আনতেই হবে। তা না হলে প্রতি মুহূর্তে হারাতে হচ্ছে এক একজন মানুষ। টেলিভিশনে লাইভ এবং প্রতিনিয়ত খবরে জানান দিচ্ছে উদ্ধার অভিযান চিত্র। মৃতের সংখ্যাবৃদ্ধি ক্রমেই মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করছে।

স্বজন হারানোয় আহাজারি

০১ মে ২০১৩ ভোর বেলায় চলে যাই রানা প্লাজাস্থলে। সাথে ক্যামেরা এবং ভরাক্রান্ত মন। স্থান পেলাম রাস্তার পশ্চিম পার্শে মিডিয়ার ক্যামেরা ভিড়ের মধ্যে একটি একতলা ভবনের উপরে। এখান থেকেই লাইভ প্রোগ্রাম করছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া মাধ্যমসমূহ। প্রাণপণ চেষ্টা করেও মানুষকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। বাঁচানো যাচ্ছে না মানুষকে। ফুটে উঠছে অসহায়ত্বের আকুলতা। কোন একজনকে উদ্ধারমাত্রই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মৃত হলে অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাণ থাকলে হাসপাতালে। অবস্থা বুঝে এনাম মেডিক্যাল, ঢাকা মেডিক্যাল, পঙ্গু হাসপাতাল বা অন্যত্র চিকিৎসা কেন্দ্রে। অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ছিল ভয়াবহতম কষ্টের স্থান। মৃত ব্যক্তি আসা মাত্র ছুটে যাচ্ছেন স্বজনরা। মিলিয়ে দেখছেন, সাথে ছবি। মৃত ব্যক্তির চেহারার স্বাভাবিকতা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। চিনতে হলে জামা-প্যান্ট, সেলোয়ার-কামিজ, পরিধেয় বস্তু, বস্ত্রই ভরসা। স্বজনদের আহাজারি সহ্য করার মতো নয়। তাদের সাথে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, বেসরকারি সংস্থার কর্মীবৃন্দ, উদ্ধারকর্মীবৃন্দসহ সাধারণ প্রতিটি মানুষকে আমি কাঁদতে দেখেছি। এ উদ্ধার অভিযান চলে ১৩ মে ২০১৩ পর্যন্ত। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১ শত ৩৪ জন। আহত উদ্ধার করা হয় প্রায় ২ হাজার ৫ শত শ্রমিক বোন-ভাইদের। এটি আধুনিক মানবের ভবন ধ্বস ও তৈরি পোশাক খাত উভয় ইতিহাসে বড় দুর্ঘটনা।

মাহমুদুল হাসান হৃদয় যিনি দুর্ঘটনার সময় রানা প্লাজার ৯ম তলায় ছিলেন, তিনি ২ বছর পূর্বে ২৩ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ধ্বংস হওয়া রানা প্লাজা’র সামনে ১১ দফা দাবি নিয়ে অনশন শুরু করেছিলেন। এ তথ্য ডেউলি স্টার থেকে গ্রহণ করা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে: দুর্ঘটনার শিকার প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪৮ লক্ষ টাকা করে প্রদান; পুনর্বাসন; আজীবন চিকিৎসা সহায়তা; রানা প্লাজার দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা; দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহত ব্যক্তিদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা খরচ বহন; দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি; দোষী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: উদ্ধারকারীদের চিকিৎসা সহায়তা: নিহত-আহতদের উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী সৌধ নির্মাণ; নিহত, আহত এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের চাকুরির ব্যবস্থা।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার আজ পার হচ্ছে ৮ টি বছর। শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশে শ্রম আইন ২০০৬ রয়েছে। ইতিমধ্যে এ আইনের উপর বিধিমালাও তৈরি হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। মানুষের অধিকার হরণ একটি বড় অন্যায্যতা। মাহমুদুল হাসান হৃদয় এর সকল দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এবং তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন এর সক্ষমতাও রয়েছে। আজ ২৪ এপ্রিল ২০২১ রানা প্লাজার ট্রাজেডিতে নিহত এবং আহত বোন-ভাইদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আপনাদের মহান জীবন এবং ত্যাগের বিনিময়ে আজ তৈরি পোশাক খাত পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সুসংহত ও সুদূর প্রসারি হয়েছে। সঙ্গতভাবেই বাংলাদেশ হয়েছে আরও সমৃদ্ধ। তাই নিহতের পরিবারের সদস্য এবং আহত শ্রমিক বোন-ভাইবৃন্দের অধিকারসমূহ প্রাপ্তিতে রাষ্ট্র, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহল উদ্যোগী হয়ে বাস্তবায়ন করবেন। এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ