রোজিনা ইসলাম দেশের প্রেরণা আশার আলো/ রুহুল ইসলাম টিপু

রোজিনা ইসলাম দেশের প্রেরণা আশার আলো

রুহুল ইসলাম টিপু

রোজিনা ইসলাম কারাগারে। তিনি বাংলাদেশের সাহসী ও দক্ষ একজন সাংবাদিক। প্রথম আলো’র জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার তারকাখ্যাত বিশ্বস্ত একটি নাম রোজিনা ইসলাম। আজকের ঘটনাই আগামী দিনের ইতিহাস। রাষ্ট্র, সরকার, জনস্বার্থে লিখিত রোজিনা ইসলাম এর প্রতিবেদনগুলোর মান এবং গুরুত্ব বিবেচনায় ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

১৭ মে ২০২১ সোমবার রোজিনা ইসলাম করোনা প্রতিরোধ টীকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে সচিবালয় গিয়েছিলেন। পেশাগত দায়িত্বপালন। এরপর তিনি আর বাসায় ফিরেননি। ১৮ মে রোজিনা ইসলামকে রিমান্ডে নেয়ার জন্য পুলিশের আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। ২০ মে জামিন আবেদনের শুনানি হয়। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল এদিন জামিনে রোজিনা ইসলাম বেরিয়ে আসবেন। আদালত তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। আদালত জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন আগামী রবিবার ২৩ মে। প্রতীক্ষার পালা শেষ হচ্ছে না। তিনি কারাগারের ভিতর। বিচ্ছিন্ন কন্যা, স্বামী, পরিবার, কর্মস্থল হতে। সকলেই তাকিয়ে আছি আদালতের দিকে। রবিবার হয়ত ভালো খবরটিই আসবে। তাহলে সাতদিন কাটবে রোজিনা ইসলামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, থানা, আদালত ও কারাগার জীবন। ভিন্ন কিছু ঘটলে বন্দী জীবন আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভবনা। এখন পেশাগত দায়িত্ব পালনের নির্মম যন্ত্রণা কাতর মানুষটির নাম রোজিনা ইসলাম। তিনি ডিএমপি শাহবাগ থানা, ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিমের আদালত হয়ে গাজীপুর কাশিমপুর কারাগারে অবস্থান করছেন। আমরা উৎকন্ঠিত রবিবার তাঁর জামিন নিয়ে। এদিন জামিন না হলে হতে হবে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ। জামিনের জন্য আপিল প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ। শুনানির লাইনও লম্বা। সময়টা আবার করোনাকাল।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম এর বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দন্ডবিধিতে চুরির অভিযোগ আনা হয়। ধারা ৩৭৯ ও ৪১১। দন্ডবিধি ৩৭৯ ধারায় বলা আছে, ‘চুরির শাস্তি। যদি কোন ব্যক্তি চুরি করে তাহলে সে ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে-যার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদন্ডে বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হবে।’ দন্ডবিধি ৪১১ ধারায় বলা আছে, ‘অসাধুভাবে চুরিকৃত মাল গ্রহণ করা। যদি কোন ব্যক্তি কোন মাল চোরাই মর্মে অবহিত হয়ে বা তা চুরিকৃত মাল মর্মে বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্বেও উক্ত চুরিকৃত মাল অসাধুভাবে গ্রহণ বা রক্ষণ করে তাহলে ঐ ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে-যার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত হতে বা অর্থদন্ডে উভয়বিধ দন্ডে দন্ডিত হবে।’ দায়েরকৃত মামলায় ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি সরানো ও অনুমতি না নিয়ে ছবি তোলার অভিযোগও করা হয় রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে।

সোমবার ১৭ মে রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য সচিবের পিএস এর কক্ষে ৫ ঘন্টার মতো আটক রাখা হয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায় তাকে গলা চেপে ধরে রাখা হয়। তিনি অসুস্থ হয়ে মেঝেতে পরে যান। রাত আটটার দিকে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সচিবালয় থেকে ঢাকার শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা দেয়ার কথা বলে সেখান থেকে বের করে এনে সরাসরি তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন।

সাংবাদিক সমাজ, দেশের আপামর মানুষ এবং বহির্বিশ্ব সকলেই আজ রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবীতে প্রতিবাদমূখর। সংবিধানে ৩৯(১) অনুচ্ছেদ এ বলা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চয়তাদান করা হইল।’ একই অনুচ্ছেদ এর (২)(ক) এ রয়েছে, ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (২)(খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এটাই আমাদের রক্ষা কবচ।

রোজিনা ইসলামের তথ্য সংগ্রহের ঘটনায় অভিযোগ আসে তাঁর বিরুদ্ধে। রোজিনা ইসলামকে করা হয় হেনস্থা ও নির্যাতন। এখানে আবার বিপরীত চিত্র। হেনস্থা ও নির্যাতন কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। এটি হচ্ছে অধিকার এবং মানবাধিকারের বিষয়। সংরক্ষণ এবং নিশ্চিতকরণের অনেক হাতিয়ার রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-২১(২) এ বলা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ এই সাংঘর্ষিক দৃশ্য দেখে আমরা অবাক এবং হতাশ। দেশের নাগরিকের পরিচয় ছাড়াও মহান সংবিধান আমাদেরকে করেছে আরো সম্মানিত ও গর্বিত। সেখানে ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ সেবকের হাতে মালিক নির্যাতন। আইনকে অশ্রদ্ধা করার সুযোগ কারো নেই। আমরা জনগণ আইনের শাসন প্রতিক্ষেত্রে দেখতে চাই। নির্যাতন বন্ধের প্রাথমিক দলিল জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র। এর ধারা-৫ এ বলা আছে, ‘কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানসিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তিভোগে বাধ্য করা চলবে না।’ আমাদের সংবিধানেও বলা আছে নির্যাতন নিষিদ্ধ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ অবশ্যই এসব বিষয়ে ওয়াকেবহাল। সংবিধানের ৩৫(৫) ধারায় বলা আছে,‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্চনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’

৫০ বছরের বাংলাদেশ। আমাদের অর্জনের ফিরিস্তি এখন সারা বিশ্বের চিন্তার বিষয়। রক্ষাকবচসমূহের ধারা-অনুচ্ছেদের ইতিবৃত্ত এবং আইনী প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষ এসব জানেন না। তারা রোজিনা ইসলামকে চেনেন, জানেন এবং দেখছেন। স্বেচ্ছায় কারাবরনসহ সারা পৃথিবী রোজিনা ইসলামের মুক্তির জন্য আজ রাস্তায়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘যদি তাঁদের (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) দৃষ্টিতে অন্যায় হয়েও থাকে, তাহলে তাঁরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। সাংবাদিক নেতাদের ডাকতে পারতেন, প্রেস কাউন্সিলকে বলতে পারতেন। একটা সুরাহা করতে পারতেন। তা না করে কেন ছয় ঘন্টা নির্যাতন করা হলো? নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিচারের দাবী জানান তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান ২০ মে তাঁর জন্মদিনে কেক না কেটে কলম ভেঙে রোজিনাকে হেনস্তা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানান। উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, প্রশাসন, সাংবাদিকতাসহ সব ক্ষেত্রে নারীরা যখন অগ্রসর হচ্ছেন, তখন এই ঘটনা নারী উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে। প্রাচ্যনাটের মূখ্য সম্পাদক কাজী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, যে সচিবালয়ে রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা-নির্যাতন করা হয়েছে, সেখান থেকে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন তাঁরা।

অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং স্বাধীনচিন্তার প্রতিবিম্বের একটিই নাম এখন রোজিনা ইসলাম। রোজিনা ইসলাম’এর মুক্তি চাই। রোজিনা ইসলাম দেশের প্রেরণা আশার আলো।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ