স্বাধীন ধর্ম পালনের অধিকার এবং আমরা বাংলাদেশী/ রুহুল ইসলাম টিপু

লেখক রুহুল ইসলাম টিপু

স্বাধীন ধর্ম পালনের অধিকার এবং আমরা বাংলাদেশী

রুহুল ইসলাম টিপু

নারী এবং পুরুষ। উভয়ই মানুষ। তৃতীয় লিঙ্গের হলেও তিনি মানুষ। বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। আমরা বাংলাদেশী। মানুষ সমাজবদ্ধ ও গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন যাপন করেন। সমাজ এবং গোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার আচরণের সঙ্গে আমাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীন ধর্ম এবং জীবনাচারের অধিকার একটি মানবাধিকার। নাগরিক হিসেবে আমি মানুষ এবং বাংলাদেশের ভালো-মন্দের প্রতিক্রিয়ার উর্ধে নই। আমাদের বড় অহংকারের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন। সে যুদ্ধে সকল ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ১৯৭১ সালে পেলাম ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্রপরিচালনার চার মূলনীতি। সেগুলো হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর অনুচ্ছেদ-১২ এ বলা হয়েছে, ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন, বিলোপ করা হইবে।’

দেশের সাফল্যে যেমন আনন্দে উদ্বেলিত হই। আবার মানুষের দুঃখ বেদনায় দেশের সংকটে ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ হই। ০৯ আগস্ট ২০২১ প্রথম আলো’য় প্রকাশিত একটি সংবাদ। শিরোনাম হচ্ছে, ‘খুলনায় মন্দির, দোকান ও বাড়িতে হামলা, গ্রেপ্তার ১০। ঘটনার বিবরণীতে জানা যায়, খুলনার রূপসা উপজেলায় গত শনিবার সন্ধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, কয়েকটি দোকান ও বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

১৭ মার্চ ২০২১ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হয় মুজিব চিরন্তন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এদিন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ১৮ মার্চ ২০২১ প্রথম আলো’র তৃতীয় পৃষ্ঠায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে জানা যায়, শাল্লার ধারাইন নদীর দক্ষিণপাড়ে নোয়াগাঁও গ্রামের অবস্থান। গ্রামে দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস। গ্রামের বাসিন্দা গৌরী মজুমদার (৩৫) নিজের ঘরে তছনছ হওয়া আসবাব দেখিয়ে বলেন, সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে হামলাকারীরা। হামলার একপর্যায়ে হামলাকারীরা দরজা ভেঙে ফেললে তিনি সন্তানদের নিয়ে শৌচাগারে আশ্রয় নেন। গ্রামের আরেক বাসিন্দা লোকেশ চন্দ্র দাস (৪৮) বলেন, শুধু বাড়িঘর নয়, ঘরের ভিতর থাকা প্রতিমাও ভাঙচুর করা হয়েছে। আতঙ্কে নারী-শিশুরা এখনো বাড়ি ফেরেনি। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

প্রথম আলো’য় ১১ মে ২০২১ এ প্রকাশিত আরেকটি ঘটনা। এতে বলা হয়েছে, হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকের প্রোফাইল পিকচার বদলে গেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে চঞ্চল চৌধুরী ও তাঁর মায়ের ছবি। ছবিটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী সোমবার মা দিবসে প্রকাশ করেন। ওই পোস্টেও কমেন্ট বক্সে কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারী সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করে। পরে চঞ্চল চৌধুরী সেসব মন্তব্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে লেখেন, ‘ভাই ও বোনেরা, আমি কোন ধর্মের, তাতে কী আসে যায়? সবারই সবচেয়ে বড় পরিচয়, সে ‘মানুষ’। ধর্ম নিয়ে সব রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা বন্ধ হোক। আসুন সবাই মানুষ হই। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারকা ও সাধারণ মানুষ চঞ্চল চৌধুরীর পক্ষে সোচ্চার হন। তাঁরা প্রোফাইল পিকচার বদলিয়ে হ্যাশট্যাগে লেখেন, ‘চঞ্চল চৌধুরী ইজ আওয়ার ব্রাদার’, ‘তোমার মা আমার মা’, ‘আমার মা, তোমার মা’, ‘স্টপ সাইবার বুলিং’, ‘হোক প্রতিবাদ’।

আমাদের দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক উপজাতিসহ নানান ধরনের ধর্মের মানুষের বসবাস। সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরু বলে ছোট বড় করার কোন মানে হয় না। আজ এখানে আমি সংখ্যাগুরু। আমার ধর্মের মানুষ অন্যত্র সংখ্যালঘু। এরূপ চিত্র খুবই স্বাভাবিক। উনবিংশ শতকে সংঘটিত অনেক দাঙ্গা এবং রক্তাক্তের ইতিহাস আমাদের সকলের কম বেশি জানা। এখন সভ্যতার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এ সময় এসে আবারও আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে মানুষে মানুষে দাঙ্গায় লিপ্ত হবো। এটি মেনে নেওয়া যায় না।

জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা পত্রের ধারা-২ এ বলা হয়েছে, ‘যে কোন প্রকার পার্থক্য যথা জাতি, গোত্র, বর্ণ, নারী, পুরুষ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্য মতবাদ, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, সম্পত্তি, জন্ম বা অন্য মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকেই ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সকল অধিকার ও স্বাধিকার স্বত্ববান। অধিকন্তুু কোন ব্যক্তি যে দেশ বা অঞ্চলের অধিবাসী, তা স্বাধীন, অছিভুক্ত এলাকা, অস্বায়ত্বশাসিত অথবা অন্য যে কোন প্রকার সীমিত সার্বভৌমত্বের মধ্যে থাকুক না কেন, তার রাজনৈতিক, সীমানাগত ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে কোন পার্থক্য করা চলবে না।’ ঘোষণা পত্রের ধারা-৩ এ বলা আছে, ‘প্রত্যেকেরই জীবন ধারণ, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে।’

অধিকার সংরক্ষণের বিচারে উপরের তিনটি ঘটনায় আমরা এদেশে স্বাধীনচেতা মানুষেরা খুবই ব্যথিত। আমাদের বড় দুই সম্প্রদায় হিন্দু এবং মুসলমান। এদেশে মিলেমিশে বাস করি। বাঙালি কৃষ্টি সংস্কৃতির ইতিহাস ঐতিহ্য হাজার বছরের। আমি মানিকগঞ্জের ছেলে। আমি এবং আমার বাবা একই স্কুলের ছাত্র। বাবার ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৫৫ সালে। ১৯৮৩ সালের এসএসসি’র ব্যাচ হচ্ছে আমার। এটি মানিকগঞ্জ সরকারি বালক বিদ্যালয়। বাবা চাকুরি শুরু করেন মানিকগঞ্জ শহরেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার বাবা-মা’কে তাঁর বাড়ির একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আমি এবং আমার ভাই-বোনের জন্মও হয়েছে হিন্দু বাড়িতে। শিক্ষক-ছাত্রের ভালোবাসার একটি বড় উদাহরণ। এ বন্ধনগুলো ছিল আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।

বিভিন্ন ধর্ম গোষ্ঠী মানুষের সম্মিলিত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এটি আমাদের অহংকার। এ বিশেষত্ব বাংলাদেশকে আরও মহিমান্বিত করে। অথচ গত মার্চে দেশবাসী ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক তান্ডব দেখেছে। ০৪ এপ্রিল ২০২১ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারত নিয়ে তাদের আপত্তি, তারা শিক্ষা গ্রহণের জন্য দেওবন্দে যায় না?’ আরও বৃহত্তর অন্তরের দৃষ্টিগত পরিবর্তন আমাদের বড়ই প্রয়োজন। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে মিলে মিশে চলাই অগ্রগতি। বাংলাদেশ সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখন মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক আমরা। উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। ঈর্ষনীয় সাফল্যের চাবিকাঠি আজ গবেষণার বিষয়। সকল ঐক্য। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সকল ধর্মের মানুষের সম্মিলনের সহাবস্থান। নানাবিধ সম্প্রীতির মেলবন্ধ হচ্ছে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। স্বাধীন ধর্ম পালনের অধিকার আমার আপনার সকলের। আসুন, আমরা বাংলাদেশীরা সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে এ অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে বাস্তব এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ