কবি শামীমা নাইস: তাঁর কবিতা ও কাব্য জগৎ/ মোশাররফ হোসেন চৌধুরী

কবি শামীমা নাইস: তাঁর কবিতা ও কাব্য জগৎ

মোশাররফ হোসেন চৌধুরী

প্রত্যেক মানুষের জীবন অনেকটা কবিত্বপূর্ণ শুধু সাহিত্যে নয়- তাঁর ধর্মে, কর্মে, কথায়, চিন্তায় এবং যাপিত জীবনবোধে কবিত্বকে অস্বীকার করা যায় না। মানব হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তিগুলো এই কবিত্বের দ্বারাই পরিপুষ্ট। সুতরাং কবিত্বকে বলা যায় বাহ্য জগতের সঙ্গে অন্তর্জগতের অথবা বস্তুজগতের সঙ্গে আধ্যাতিকতার স্বভাবগত সামঞ্জস্য; যা প্রকৃতি সৃষ্ট ক্ষুদ্র তৃণ হতে মানুষের আত্মা পর্যন্ত আত্মীয়তার সূত্র প্রসারিত করে। কবি শামীমা নাইসের বোধের বোদন হয়েছে কবিতার মাধ্যমে, তাঁর কবিত্ব বোধ প্রকাশ হতে সময় নিয়েছে, কিন্তু তিনি বাল্যকাল হতে বসন, বচন, আচরণ ও বিচরণে একজন কবিত্বের সুকুমার মানসিককতা তথা কবিমানস অন্তর্জগতে যত্ন সহকারে লালন-পালন করে আসছেন। তার যাপিত জীবনের অনু-অংশ কাব্যিক বিশুদ্ধতায় ভরপুর।মানুষ মাত্রই অল্পাধিক পরিমাণে কবি হলেও প্রকৃত কবি শক্তি পরম প্রকৃতির দান। এই সারল্য আন্তরিকতা সহনুভূতি, মায়া ও মমতা প্রভৃতি কবি জীবনের সম্পত্তি। এই বিশুদ্ধ বিশেষণগুলো দ্বারা কবি শামীমা নাইস নিজেকে রাঙিয়েছেন।

কবি কে? আমার বিবেচনায়, যার গূঢ় অন্তর্দৃষ্টি আছে। বস্তুর মধ্যে যিনি সামঞ্জস্যসহ ভূত ও ভবিষ্যত দেখেন; প্রকৃতির অন্তরালে যিনি সঙ্গীতের আভাস পান, মানুষের আনন্দে যিনি উদ্ভাসিত হন, কষ্টে যিনি বিবস হয়ে যান তিনিই কবি। সেই বিবেচনায় শামীমা নাইস একটি উত্তরাধুনিক কবিসত্বা।

কবির প্রতিভা ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়ে প্রকাশ ও বিকাশ হতে পারে। নিজের সুখ-দুঃখময় জীবন, মানুষের হাসি-কান্না, আশা-দুরাশা, উত্থান-পতন, স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের মাঝ দিয়েই কবি চিত্ত ও চৈতন্য প্রস্ফুটিত হয়।
কবি শামীমা নাইস তাঁর প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের নাম রেখেছেন ‘‘নিমগ্ন প্রার্থনায়’’ তুমি- এই তুমি টা কে? বিশেষ কোন ব্যক্তি, বস্তু নাকি ভাব? কবিই তা ভালো বলতে পারবেন। একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়- কবি প্রকৃতির বিচিত্র-বিশাল সৌন্দর্য, নান্দনিক প্রেম মানবীয় সুখ-দুঃখ, পাওয়া- না পাওয়া, আশা-হতাশা, অর্জন-বিসর্জনের সঙ্গে ‘‘তুমি’’ শব্দ দ্বারা পরম আত্মীয়তা করেছেন।

কবিত্ব ও কবিতা ভিন্ন বিষয়; কবিত্ব প্রাণে, কবিতা ভাষায়, সকলেই কবিতা লিখতে পারেনা কিন্তু সকলেই অল্পাধিক পরিমাণে কবি। মানুষের প্রাণের অতি সামান্য শৈল্পিক ভাব ও বোধ গুলোও কবিত্ব প্রসূত। কিস্তু এই ভাব ও বোধ গুলোকে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে প্রকাশ করতে সকলেই পারে না। কবি শামীমা নাইস তাঁর ‘‘শোকার্ত কাক’’ কবিতায় সহজ সরল শব্দ দ্বারা গভীর ভাব প্রকাশ করেছেন।
‘‘সেদিন পাড়ার মোড়ে দেখলাম
কাকদের বিক্ষোভ
কারণ খুঁজতে ছুটে গেলাম কাকদের কাছাকাছি
দেখলাম একটা মরা কাক পথের পাশে,
নীরব, নিথর ও নিস্তব্ধ!
বুঝলাম, কাকদের বিক্ষোভের কারণ
স্বজন হারানোর শোক,
স্বজনের প্রতি সু-গভীর প্রেম’’

এখানে কাক সমাজের মাঝেই একজন পাঠক সীমাবদ্ধ থাকতে পারে অথবা কাক সমাজের জায়গায় অন্য সমাজ ভাবনায় দাঁড় করিয়ে তার ভাবের জন্য কাব্যিক অলংকার বা প্রসাধন দিয়ে রাঙিয়ে তুলতে পারে।
বাঙালি অতি সরল এবং কবিত্ব প্রিয় জাতি, বাঙালি হৃদয়ে প্রেম প্রীতি, দয়ামায়া, ভক্তি, করুণা কবিতার এই স্থায়ী গুণগুলো অতি সহজে প্রবেশ করে। সুজলা, সুফলা এই গাঙ্গেয় বঙ্গভূমি কবিত্বের যেন একটি মধুভান্ড। এই ভূমির মানুষ প্রায় সকলেই অল্প বিস্তর হলেও কবিতা প্রিয়। এই জন্য এই জাতি আদিম সময়ের কবিতাকেও অতি আদরের সঙ্গে হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছে। উত্তরাধুনিক সময়ের কবি, কবি শামীমা নাইস। বঙ্গের আদিম গ্রন্থ কবি বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, গোবিন্দ দাস সহ অনেক প্রাত: স্বরণীয় কবিগণের যোগ্য উত্তরাধিকার।কবি ও কাব্য সম্বন্ধে যেটুকু আলোচনা করেছি তা তত্ত্ব আলোচনা নয়, যদি কেউ সে ধারণা করে থাকেন তাহলে নিরাশ হতে হবে, কারণ কাব্য কোন তত্ত্বকথা নয়। কাব্য পরিচয় তথ্যানুসন্ধানের মত হলে কাব্যের মাধুর্য ও সৌন্দর্য উহ্য হয়ে যাবে।

সৌন্দর্যের গুণ এবং আবেগের তীব্রতা কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত। কবিতা, কাব্য বা পদ্য হচ্ছে শব্দ প্রয়োগের ছান্দসিক, অনিবার্য ভাবার্থের বাক্য বিন্যাস, কবির আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তার সংক্ষিপ্ত রূপ; উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের সাহায্যে আন্দোলিত সৃষ্টির উদাহরণ। কবিতা Poetry (Greek poiesis থেকে প্রাপ্ত) এমন এক ধরনের সাহিত্য, যেখানে ভাষার নান্দনিক এবং প্রায়শই ছন্দময় গুণাবলী ব্যবহার করা হয়। কবিতা হলো কবির অনুভূতি, চিন্তাভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য শব্দ এবং ভাষা ব্যবহার। কবিতা হলো রূপক, প্রতীক এবং অস্পষ্টতার মাধ্যমে সাহিত্যের অংশ তৈরী করার প্রক্রিয়া ইত্যাদি। কবি রবার্ট ফ্রস্ট/ Robert Frost যিনি তার কবিতায় মাত্র একটি বাক্যের জন্য পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছেন “Miles to go before I sleep” তিনি কবিতার বিষয়ে অসাধারণ কথা বলেছেন। রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘‘কবিতা হলো, যখন আবেগ তার চিন্তা খুঁজে পায়, আর চিন্তা শব্দ খুঁজে পায়।’’ কী চমৎকার সংজ্ঞা!

যাহোক, কবিতার আরো অনেক সংজ্ঞা আছে; একেক কবি একেকভাবে কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন। তবে আমার মতে কবিতার সবচেয়ে সহজ এবং সাদামাটা সংজ্ঞা হলো, মানুষের অনুভূতি, ধারণা/কল্পনার নান্দনিক প্রকাশই কবিতা। কবিতার বিষয়ে আমি যতোটুকু পড়েছি, তাতে আমার কাছে আমার সংজ্ঞাটাই সবচেয়ে সহজ মনে হয়েছে। কবি শামীমা নাইসের কবিতাগুলোর বিশেষত্ব হলো তিনি শুধুমাত্র আবৃত্তির জন্য কবিতা লিখেননি। নিজের অনুভূতি, বিশ^াস, ধারণা/কল্পনা, প্রেম, বিরহ, অব্যক্ত আবেগ তিনি তার কবিতায় সার্থক রূপ দিয়েছেন। সেসব কারণে তার সবগুলো কবিতাই সুপাঠ্য; অনিবার্য ভাবার্থে ছন্দময় প্রয়োগে শৈল্পিক উপমায় অনন্য, অনবদ্য নান্দনিক। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তার ‘‘নিমগ্ন প্রার্থনায় তুমি’’ কবিতায় লিখেছেন,
‘‘ভালোবাসার আবেগী হাওয়ায়
নিজেকে তোমাতে হারাই
অনেক অনেক মায়ায় জড়ানো তুমি, শুধুই তুমি
আমার নিমগ্ন প্রার্থনায় তুমি।
ঘুম ঘুম দুপুর, অলস বিকেলে, সোনালী সন্ধ্যায়
মিষ্টি সকালে, ঘুমহীন নিশুতি রাতে
তুমি আমার নিঃশ^াসের কাছাকাছি এসে
আমাকে হাসতে শেখাও, ভালোবাসতে শেখাও
আমি তখন নতুন রূপে নতুন মানুষ
তুমি আমার নিমগ্ন প্রার্থনায়।
আমার প্রিয় ফুলগুলো তোমাকে ভালোবাসে
আমার কপালের লাল টিপ, প্রিয় লাল শাড়ি
প্রিয় পদ্মা নদীর রোমান্টিক ঢেউ
তোমাকে কাছে ডাকে
আমার গভীর বিশ^াসের উৎসমূলে একমাত্র তুমি
আমার নিমগ্ন প্রার্থনায় তুমি।’’

জীবনানন্দ দাশ (১৭ ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৯-২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক। তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম। তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি-কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তার কবিতা সৃষ্টি করার অবসর পায়।’’ জীবনানন্দ জানালেন, ‘‘কবির হৃদয়ে থাকবে কল্পনা; সে কল্পনার ভিতরে থাকবে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা। এ কারণে, যার হৃদয়ে কল্পনার প্রতিভা নেই- আর কল্পনা যদিওবা থাকে, যদি না-থাকে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বাতন্ত্রিক নির্যাস-তবে জীবনানন্দ তাকে, হতে পারেন তিনি বহুলপ্রজ এমনকী খ্যাতিমান কবিতালেখক, কবি বলতে প্রস্তুত নন।’’ জীবনানন্দ দাশের কবি ও কবিতার আলোচনার আলোকে বলা যায় শামীমা নাইস জীবনানন্দ দাশের কবি ও কবিতার মূল্যায়নে শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছেন। একটি লাল সবুজ পতাকার জন্য কবিতায় শামীমা নাইস লিখেছেন,
‘‘তারপর যুদ্ধে নয় মাস;
ত্রিশ লাখ শহীদের লাল তাজা রক্তে
ভেসে গেলো বাংলার মাটি, মাঠ, ঘাট, সবুজ ঘাস, নদী, সমুদ্র
ভেসে গেলো পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ
লুট হলো সভ্যতার শুভ্র পালক!
ধর্ষিতা লাখো লাখো মা বোনের চোখের জল
মিশে গেলো বহতা নদীর স্রোতে…’’

হাসান আজিজুল হক এক লেখায় বলেছেন, ‘‘যেবাস্তবকে অবাস্তবের সাথে মেলাতে পারে না, সে বাস্তবের পেছেনে পরাবাস্তব দেখতে পায় না। বাস্তবের পেছনে, গভীরে আরো কত বাস্তব আছে এটা যে দেখতে পায় না, সে বাস্তববাদী লেখক নয়।’’ সে বিবেচনায় কবি শামীমা নাইস সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি প্রিয় নাম। বিষয় বৈচিত্র্যে, আঙ্গিক-বিন্যাসে, শব্দ ব্যবহারে, রূপক, উপমায়, ধ্বনি-অনুরণনেও তাঁর কবিতা সমহিমায় সমুজ্জ্বল। তিনি তৈরী করে নিয়েছেন তাঁর কবিতার বাক বদলের স্বতন্ত্র ধারা, বিমূর্ত জগৎ। আধুনিক কবিতা বিনির্মাণে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর অকৃত্রিম মুন্সিয়ানা, দক্ষতার ব্যঞ্জনা। ভালোবাসার কবিতায় তিনি যেমন স্বতঃস্ফূর্ত ও সপ্রাণ, তেমনি দ্রোহ ও প্রতিবাদী চেতনায়ও উচ্চকণ্ঠ। জীবনের পরতে পরতে নানা ঘটনা পরম্পরায় ঘাত-প্রতিঘাতে শামীমা নাইস পরিবর্তন করেছেন কবিতার আবহ, জানান দিয়েছেন তাঁর বিচিত্র ও সর্বমুখী ভাবনার কথকতা। তাঁর কবিত্বশক্তিই তার সূক্ষ্ম উৎসমূল, নিরন্তর পথ চলার প্রেরণা। তাঁর চিন্তা-শক্তি ও রচনাভঙ্গি গভীরতার পরিণতির দিকে ধাবিত। তিনি বিশিষ্ট তাঁর বক্তব্যে, স্বতন্ত্র তাঁর নিজস্ব দৃষ্টি ও সৃষ্টিশক্তিতে। কাব্যরচনায় নিরলস পরিশ্রমের একজন ব্যতিক্রমধর্মী কবি তিনি। তিনি তাঁর কবিতায় আশার কথা বলেন, ভালোবাসার কথা বলেন, নারী পুরুষের আত্মশক্তি আর সমতার কথা বলেন। সুস্পষ্টভাযে যোগ হয় মানবতা আর সম্প্রীতির কথাও।

কবিতা আবৃত্তিতেও শামীমা নাইস সুনিপুণ। তাঁর দৃঢ় উচ্চারণে কবিতা হয়ে ওঠে আরো জীবন্ত, প্রাণবন্ত। তিনি তাঁর আপন আলোয় পথ চলেন, সেসব কারণে শূণ্যতার প্রতিবিম্বেও দেখেন অতল জোছনা। কবিতা তাঁর ধ্যান জ্ঞান সাধনা। কবিতা তাঁর প্রেম। ভিন্ন আঙ্গিক বা মাত্রায় লেখার কারণে তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‘নিমগ্ন প্রার্থনায় তুমি’’ কবিতাপ্রেমীদের মনে সাগ্রহে ঠাঁই করে নিয়েছে। তিনি তাঁর লেখায় বহ্নি শিখার মতো জ¦লে ওঠেন। ‘‘শুন্যতার প্রতিবিম্বে অতল জোছনা’’ কবি শামীমা নাইসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। পাঠকপ্রিয় জাতীয় পত্রিকাসমূহে এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

তিনি ছাত্রজীবন থেকেই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় মনোযোগী হন। লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসবে এবং রেডিওতে কবিতা আবৃত্তি করেন। বৃত্তবন্দী নারীদের পশ্চাৎপদ জীবন তাকে পীড়া দেয়। তিনি তাই অগ্রবর্তী অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ হিসেবে নারী পুরুষের সমতার কথা বলেন। শামীমা নাইসের কবিতায় পাঠকের সুপ্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলার কষ্টার্জিত শ্রমলব্ধ প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। তাঁর প্রতিটি রচনা যেমন গভীর ও অতলস্পর্শী, তেমনি ব্যাপক। তাতে আছে বিষয় ও ভাষার কারুকাজ, আছে অভিনব বর্ণনা, আছে ঔদার্য ও বিস্ময়। তার কবি জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই সহজাত প্রতিভার সঙ্গে প্রজ্ঞার, মেধার সঙ্গে অনুভূতির আশ্চর্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণের সঙ্গে ধারণ করেছেন ছন্দ ও আঙ্গিক প্রকরণের ঐতিহ্যকে। এক কথায়, শামীমা নাইসের কবিতা ছন্দনৈপুণ্যে অসামান্য এবং গভীরতায় অসাধারণ চিত্রময়। তাঁর কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার চরণে চরণে নিজের সম্মোহনী কবিশক্তির পরিচয় দিয়েছেন, পাঠকের মনে এক ধরনের আনন্দবোধের জাগরণ সৃষ্টি করে এবং প্রত্যেক কবিতার প্রতিচরণে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন এমন সব মুগ্ধতাশ্রয়ী চিত্রকল্প যার ফাঁদে আটকা পড়ে রসভোক্তার চিত্ত। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় গুণ শৈল্পিক কল্পনা। এমন কি যখন তিনি মানবিক বক্তব্য কবিতায় তুলে ধরেন তখনও তা গভীর রহস্যময় কাব্যকৃতিকে ছুঁয়ে থাকে। তার কবিতা দাবি করে পাঠকের গভীর অভিনিবেশ।

এক সহজাত কবিপ্রতিভার অধিকারী তিনি। তাঁর কবিতার মর্মমূলে নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে চিরকালীন নারী ও নিসর্গের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে, যা বাংলা কবিতার শক্তি ও সম্ভাবনাকে ভিন্ন মাত্রায় প্রসারিত করেছে। আর এ জন্য তিনি সমকালীন সময়ে তো বটেই, চিরকালীন বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্রস্বরের কবি হিসেবে নন্দিত। তাঁর কবিতায় নারী-পুরুষের প্রথাগত প্রেমের অনুরণন কোথাও অনুভূত হয় না; বরং প্রেমময় এক জীবনতৃষ্ণার অফুরন্ত আকাঙক্ষা গভীর এক রহস্যময়তায় উন্মোচিত হতে দেখা যায়।

তিনি মা-মাটি ও মাতৃভূমির বেদনাকে নিসর্গের ক্যানভাসে বিচিত্র রঙ ও রেখায় একজন নিপুণ শিল্পীর অসামান্য কল্পনায় অঙ্কন করেন বহুমাত্রিক শব্দচিত্রে। সুতরাং কবিতার সংজ্ঞার বিষয়ে যা কিছু বলেছি, সে হিসেবে সেসবের মানদন্ডে শামীমা নাইসের কবিতা মানোত্তীর্ণ। কবি শামীমা নাইসকে কবিতার ভুবনে সুস্বাগতম। তিনি আরো অনেক কবিতা লিখবেন সেই প্রত্যাশায় কবিকে অভিনন্দন, শুভ কামনা। কবিতায় তার আজন্ম বসবাস পূর্ণতা, সফলতা লাভ করুক। কবি ও কবিতার জয় হোক।

Karcha/ SN

Facebook Comments Box
ভাগ