রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার এবং কিছু মিথ/ অপূর্ব চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার এবং কিছু মিথ

অপূর্ব চৌধুরী

বই কখনো নোবেল পুরস্কার পায় না। একজন লেখকের সমগ্র জীবনের কাজের মূল্যায়নে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হয়।
অনেকের ধারনা, গীতাঞ্জলির জন্যে রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেয়া হয়েছে! এটি ভুল। বিশাল মাপের এই দীর্ঘ ভুল রবীন্দ্রনাথকে ছোট করার একটি ভুল চেষ্টা মাত্র।

রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেয়া হয়েছে বিশ্বমানের লেখার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় যুগান্তকারী অবদানের জন্যে। শুধু গীতাঞ্জলির জন্যে নয়। গীতাঞ্জলি এখানে একটি উদাহরণ হিসাবে এসেছে। এটি সব লেখকদের ক্ষেত্রেই করা হয়। পুরস্কারের আগে পর্যন্ত লেখা সব লেখা বা বইয়ের কথা উল্লেখ না করে কিছু লেখা বা বইকে উল্লেখ করে লেখকের কাজকে ব্যাখ্যা করা হয়।
প্রতিটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেয়ার সময় সুইডিশ একাডেমির সে বছরের নোবেল প্রাইজ কমিটির একজন সেই বিষয় এবং নোবেল পাওয়া ব্যক্তির উপর একটি বিবৃতির আকারে বক্তৃতা দেন। কখনো চেয়ারম্যান, কখনো চেয়ারম্যান মনোনীত কেউ। সেখানে উল্লেখ করা হয় কেন তারা তাকে পুরস্কারের জন্যে মনোনীত করেছেন।

১৯১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর নোবেল প্রাইজ কমিটির চেয়ারম্যান Harald Hjärne সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ঘোষণা করে প্রায় ৩ হাজার শব্দের একটি বক্তৃতা দেন। যে কারণে রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে, তার প্রধান কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে শুরুতেই বলেন: the Anglo-Indian poet, Rabindranath Tagore, the Academy has found itself in the happy position of being able to accord this recognition to an author who, in conformity with the express wording of Alfred Nobel’s last will and testament, had during the current year, written the finest poems «of an idealistic tendency.

রবীন্দ্রনাথ লেখক এবং কবি হিসাবেই প্রথম বিবেচ্য। কবিতার শক্তিই রবীন্দ্রনাথকে বড়ো করেছে। অনেকে ভুল করে রবীন্দ্রনাথ এবং বব ডিলেনকে গানের জন্যে একমাত্র সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার হিসাবে বলেন। এটিও ভুল। এই ভুলের জন্ম আরেকটি ভুল থেকে। গীতাঞ্জলি।

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থটি মূলত প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। গীতাঞ্জলি গীতের বই নয় কেবল! বেশিরভাগ কবিতা এবং কিছু গান। কাব্যগ্রন্থটি তে কবিতা ও গানের সংখ্যা ১৫৭ টি। ১৯০৮ এবং ০৯ সালে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা এবং কিছু গানকে একত্র করে ১৯১০ সালে গীতাঞ্জলি নামে প্রকাশ করেন কবি।

১৯১২ সালের নভেম্বরে ইংল্যান্ডে ইন্ডিয়ান সোসাইটি নামের ভারতীয় একটি সংগঠনের উদ্যোগে ১০৩ টি কবিতা ও গান নিয়ে কবি ইয়েটসের ভুমিকা সহ ৪ শিলিং দামে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ বের হয়। নাম: Song Offerings. এই Song Offerings-এ গীতাঞ্জলি থেকে মাত্র ৫৩ টি কবিতা ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাকি ৫০ টি কবিতা ১৮৯৯ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত ৯ টি বই থেকে সংকলন করা হয়েছে। সে গুলো ছিল: গীতিমালা থেকে ১৬ টি, নৈবদ্য থেকে ১৫ টি, খেয়া থেকে ১১ টি, শিশু থেকে ৩ টি, স্মরণ থেকে ১ টি, চৈতালি থেকে ১ টি, কল্পনা থেকে ১ টি, উৎসর্গ থেকে ১ টি এবং অচলায়তন থেকে ১ টি কবিতা নিয়ে। ইংরেজি Song Offerings. মাত্র সাড়ে সাতশো কপি ছাপা হয়েছিল।

এই আংশিক গীতাঞ্জলি ওরফে Song Offerings-কেও নোবেল কমিটি উদাহরণ হিসাবে শুরুতে ধরে বললেন: Tagore’s Gitanjali: Song Offerings (1912), a collection of religious poems, was the one of his works …. Since last year the book, in a real and full sense, has belonged to English literature, for the author himself, who by education and practice is a poet in his native Indian tongue.

ঠিক তার পরেই Harald Hjärne বললেন, Quite independently of any knowledge of his Bengali poetry, irrespective, too, of differences of religious faiths, literary schools, or party aims, Tagore has been hailed from various quarters as a new and admirable master of that poetic art which has been a never-failing concomitant of the expansion of British civilization ever since the days of Queen Elizabeth.

বইয়ের জন্য কোন লেখককে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় না। অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে তার একটি জীবন দর্শন প্রকাশিত হয় এবং যে দর্শন সভ্যতা এবং বিশ্বের কাজে লাগে।

কবির সাহিত্য কর্মের উদাহরণ হিসাবে কবিতা এবং গীতাঞ্জলির উদাহরণ বলার পর Harald Hjärne বললেন: The same estimate is true of the second cycle of poems that came before us, The Gardener, Lyrics of Love and Life (1913).

নোবেল পুরস্কারের আগেই ১৯১৩ সালে ইংরেজ কবি ইয়েটসকে উৎসর্গ করা ম্যাকমিলান থেকে পাবলিশ করা The Gardener কবির দ্বিতীয় বই, ১৮৯৯ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত ১২ টি কাব্যগ্রন্থ থেকে হুবুহু নয়, একটি ভাবের অর্থ করে কবি নিজেই কিছু কবিতা অনুবাদ করেন, যা গ্রন্থের ভূমিকায় কবি সরাসরি উল্লেখ করেন। কাব্যগ্রন্থ হলো: কনিষ্ক, কল্পনা, সোনার তরী, চিত্রালী, উৎসর্গ, চিত্রা, মানসী, মায়ার খেলা, খেয়া, কড়ি ও কোমল!

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মবাদ, ঈশ্বর-নিরীশ্বর এবং মানুষের গভীর বোধের সমন্বয় তৎকালীন ইউরোপের একটি শূন্যতা বোধের বিকল্প অনুসন্ধান হিসেবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ইউরোপীয় দর্শন বৃত্তের এবং চিন্তাবীদদের জন্যে একটি নতুন সংযোগ ছিল। সেটারই স্বীকৃতি ছিল নোবেল পুরস্কার।

শুধু কবিতার জন্যেই কিংবা গীতাঞ্জলির জন্যে রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেয় নি! রবীন্রনাথের গদ্য এবং গল্পের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে Harald Hjärne বলেন : English translations of Tagore’s prose stories have been published under the title Glimpses of Bengal Life (1913). ….. their content gives evidence of his versatility and wide range of observation, of his heartfelt sympathy with the fates and experiences of differing types of men, and of his talent for plot construction and development.

রবীন্দ্রনাথের মেজো ভাই সত্যেন্দ্রনাথের মেয়ে ইন্দিরা দেবী এবং অন্যানদের লেখা চিঠিপত্র যা ছিন্নপত্র নামে বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ সেই চিঠিগুলোর কিছু ইংরেজি Glimpses of Bengal Life এবং পরবর্তীতে আরেকটি Torn Leaves নাম প্রকাশ করেন।

এখানেই শেষ নয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গানের পর ছোটগল্প, চিঠিপত্র গদ্যের প্রশংসার পর Harald Hjärne বললেন:
Tagore has since published both a collection of poems, poetic pictures of childhood and home life, symbolically entitled The Crescent Moon (1913), and a number of lectures given before American and English university audiences, which in book form he calls Sâdhanâ: The Realisation of Life (1913).

Crescent Moon ছিল ১৯১৩ তে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের আগে লেখা ৪০ টি বাংলা কবিতার একটি ট্রান্সলেশন। এক গুচ্ছ প্রবন্ধের বই সাধনা, যা The Realisation of Life নামে একই বছর প্রকাশিত হয়েছিল।

ঠাকুরের লেখা এবং চিন্তাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে Harald Hjärne বলেন: Tagore stand out as a poet of rich endowment, characterized by his great profundity of thought, but most of all by his warmth of feeling and by the moving power of his figurative language.

রবীন্দ্রনাথ আমাদের গর্ব। রবীন্দ্রনাথ শুধু গীতাঞ্জলির জন্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যারা এটি বলেন, লেখেন, তারা রবীন্দ্রনাথ এবং নোবেল, দুই ব্যাপারেই ভুল।

কড়চা/ এ সি

Facebook Comments
ভাগ