আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ/ রুহুল ইসলাম টিপু

আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ

রুহুল ইসলাম টিপু

দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো। এবারও করোনা’র মাঝে। গতবারের ঈদও উপভোগ্য হয়নি। দেশ এবং বিশ্ব চলছে করোনাবিধিতে। করোনা সংকটের মাঝেই হবে ঈদের নামাজ। সেমাই, পোলাও, ফিন্নি, নতুন পোশাক আনন্দে ভাসবে পৃথিবী। আমার হবে আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ। আব্বা ছিলেন আমার সব। তাঁর হাত ধরে পৃথিবী দেখা, জ্ঞান-বিদ্যা অর্জন, মানুষ হওয়ার চেষ্টা। আমি মানিকগঞ্জের ছেলে। ছোটবেলা কাটে বেউথা সরকারি কোয়াটারে। স্কুল পেরোনোকালে বেউথা’য় ক্রয়কৃত নতুন বাড়িতে। ফায়ার সার্ভিসের নিকটে একটি মসজিদ আমাদের সময়েই গড়ে তোলা হয়। ঈদের নামাজে আব্বা নিয়ে যেতেন মানিকগঞ্জ স্টেডিয়ামে। জায়নামাজ হাতে, সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি, গোল টুপি পড়ে আব্বার সাথে মাঠে যেতাম। সাথে আমার আরও দুই ভাই। নামাজ শেষে কোলাকুলি। বাসায় এসে খিচুড়ি, মাংস খাওয়া। প্রতিবেশির বাসায় যাওয়া ও খাওয়া, কদমবুছি। ঈদ উদযাপনের রীতি। সব বছর ঈদে আমাদের টাউনে থাকা হতো না। পালাক্রমে রোজার ঈদ ঝিটকা’য় নানা বাড়িতে। কোরবানির ঈদ মান্তা’য় দাদা বাড়িতে। আবার টাউনের বাসায়। বর্ষাকালে রোজার শেষদিন বেউথা ঘাট অথবা কোয়াটারের বাসার সামনে হতে নৌকায় রওয়ানা হতাম। এসময় বাংলাদেশের খাল বিল মাঠ ঘাট নদী নালা পানিতে টইটুম্বর থাকে। নৌকায়ই ছিল চলাচলের অবলম্বন। ছৈওয়ালা নৌকা। পিছনের গলুইএ বসার মজা ছিল অন্যরকম। আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া হতো গলুই এ বসার জন্য। গলুই এর জায়গা কম। তিন জন বসা কষ্টকর। ছৈ এর উপরে উঠা বারণ। আব্বা মা’র ধমক। পড়ে যেতে পারি। বৈঠা ধরে টান এবং বাওয়া এসবের মজা ট্রলারে হবে না বা অন্য কিছুতে নেই। মাঝির বৈঠা ছিল অনেক ভারী। আমাদের হাতে থাকত ছোট বৈঠা। নৌকা নবগ্রাম, নালী, সুরুপাই, উফ্যাজানি, কলতা, বিজয়নগর, কৌড়ী, সোনাকান্দা হয়ে আসতেই সূর্য ডুবি ডুবি করতো। এসময় আব্বা পশ্চিম আঁকাশে চাঁদ দেখার জন্য চলে আসতেন পিছনের গলুই এর কাছে। চাঁদ দেখে মোনাজাত করতেন। মাঝির সানকি দিয়ে টলমল করা পানি মুখে দিতেন। রোজা ভাংলেন। পড়লেন মাগরিবের নামাজ। এখনকার মতো খাবার সাথে নিয়ে যাওয়া তেমন দেখিনি। এসবের সাথে সামর্থের বিষয়টিও জড়িত ছিল। গোয়ালবাগ নানা বাড়িতে গিয়ে খাবার খাওয়া। পরদিন ঈদ। মাঠে নামাজ পড়া। রঙিন কাগজ তিনকোণা করে ছোট ছোট কাটা। চিকন দড়ির সাথে আঠা লাগানো। সারা মাঠ রঙিন করা হতো। মামাত ভাইদের সাথে এসব কত করেছি।

আব্বা আমাদের তিন ভাইয়ের আবদার রাখতেন। আমরা বাজি কিনতে যেতাম আব্বার সাথে মানিকগঞ্জ বাজারে। মাছ বাজারের উত্তর দিকে দুটি বাজি পটকার দোকান ছিল। লম্বা কাঠির মাথায় বারুদ রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়ানো। লাঠি সজোড়ে কোন কিছুর উপর আঘাত করলেই শব্দ হতো। তবে গাইটা যেটি আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত নিক্ষেপ করতে হয়, এটি কিনে দিতেন না। তারা বাতি দিয়েছেন। রাতে ঝলমল করে জ্বলে। এসব ছিল আমাদের ঈদ উৎসবের অনুষঙ্গ। আব্বা দেখতেন আর মৃদু হাসতেন।

ঈদ ধর্মীয় উৎসব। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের এক মাস সিয়াম সাধনার পরদিন আসে ঈদ। আব্বা রোজা রাখতেন। মা’ও সেরূপ ইবাদত করেন। আব্বা ছাত্রাবস্থায় আমাদের গ্রাম মান্তার মোল্লা ছিলেন। মোল্লাকে দিয়ে নামাজ পড়ানো; জ্যৈষ্ঠ মাসে মোল্লাকে আম কাঁঠাল খাওয়ানো এ গল্প শুনেছি আমি আমার দাদীর নিকট হতে। ঈদ এবং রোজা এলে নতুন জামা কাপড়ে আমরা আব্বাকে বেশ উতলা করেছি। এখন বুঝি তাঁর সে সময়ের কষ্ট। আমরা রোজার মাঝামাঝি সময়ে বায়না ধরতাম পোশাকের জন্য। এখনকার মতো তৈরী পোশাক ছিল না। কাপড় কিনা, টেইলর এ যাওয়া, মাপ দেওয়া এসব। আব্বার অফিস ছিল রিজার্ভ ট্যাঙ্কের উত্তর পশ্চিম কোণায় কৃষি অফিস। সাবেক প্রয়াত সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন খান এর বাড়ি। আমরা দৌড়ে চলে যেতাম। তিনি আমাদের তিন ভাইকে নিয়ে যেতেন পূর্বের শরৎ প্রেসের উত্তর দিকে রাস্তার পশ্চিম পাশের্^র টেইলার্স এ। টেইলার্স এর নাম ও দাদাদের নামও ভুলে গিয়েছি। তারা দুই ভাই এ টেইলার্স চালাতেন। আব্বাকে কাকা কাকা বলে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। আমাদেরকেও দিতেন বড় ভাইয়ের আদর। মাপ দেওয়া হলো। কাপড় আসবে আব্বা’র বেতন বা বোনাস পাওয়ার পর। টেইলার্সেও ভীড় বাড়ে। ঈদের পূর্বে জামা পাওয়া ভারী মুশকিল। চোখ ছল ছল করে বাসায় ফিরি। কখনও আব্বা অনেক রাত করে টেইলার্সে বসে থেকে জামা নিয়ে আসতেন। অর্থের অভাবে অনেক কিছু থেকেই আমরা হয়েছি বঞ্চিত। কিন্তু আব্বার ক্লান্তির এবং ভালোবাসার কোন অভাব দেখিনি। ঈদকে আনন্দঘন করার জন্য আমাদেরকে দিয়েছেন তাঁর সাধ্যমত। মা’কে এবং তাঁকে তেমন কিছু নিতে দেখিনি। তবে ঈদে আব্বার হাফ হাতা স্যান্ডো সাদা গেঞ্জি, একটি রুমাল, আঁতর, টুপি লাগবেই। মৃত্যুর কিছু বছর পূর্বে তিনি নিজে দোকানে যেয়ে কিনতে পারেননি। মা আব্বাকে কিনে দিয়েছেন। এমন কি গতবছরের ঈদেই এর বাত্যয় ঘটেনি।

আব্বার ছিল সিগারেট ধুমপানের অভ্যাস। তবে তিনি রোজার মাসে ধুমপান করতেন না। মা বলতেন, রোজার মাস ছাড়তো পারো, অন্য সময় কেন নয়। এ নিয়ে বেশ ঝগড়া এবং রসিকতা হতো। সম্ভবত: ’৮৯ বা ’৯০ সালের ঈদের পর মা একদিন সন্ধ্যা বেলা যতিন ঘোষের দোকান হতে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি এনে খাওয়ালেন। যতিন কাকাবাবুর মিষ্টির দোকান সেসময় আমাদের শহরে খুব প্রসিদ্ধ। দেবেন্দ্র কলেজের সামনে দোকানটি। এটি পরবর্তীতে ফরহাদ ভাইয়ের আব্বা লাল মিঞা কাকা ক্রয় করেন। জানা গেল, আব্বা চিরতরে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন। ঐ বছরের ঈদ বা তৎপরবর্তী মিষ্টি উৎসবের পর আর আব্বাকে ধুমপান করতে দেখিনি। তিনি মা’কে কথা দিয়েছিলেন। অঙ্গীকার তিনি রেখেছেন। আজ ঈদ পূর্ব ভাবনায় স্মৃতিগুলো আব্বাকে হারানোর কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়।

আব্বা ঈদের দিন সকালে ঘুম হতে উঠে ফজরের নামাজ পড়তেন। এরপর বেশ সময় নিয়ে কোরআন শরীফ পাঠ করেন। গোসল, পায়জামা, পাঞ্জাবী পড়ে ঈদের নামাজের জন্য প্রস্তুতি। এসময় সামান্য মিষ্টি মুখ ও পানি। ঈদের নামাজ শেষে তিনি খাবেন খিচুড়ি আর গাওয়া ঘি। শত প্রতিকূলতায়ও এটির ব্যতিক্রম হয়নি। অসম্ভব ধর্ম বিশ্বাসী একজন মানুষ। কিন্তু কাউকে কোনদিন কোনকিছুর উপর জোর করে তিনি করাতেন না। আমাকে তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন। ধর্ম এবং কর্মের জন্য তিনি কখনও আমার এবং অন্য কারো উপর জোর খাটাতেন না। ব্যক্তি স্বাধীনতায় তিনি কখনও হস্তক্ষেপ করতেন না। অনন্য সাধারণ, দৃঢ়চেতা, সৌখিন তো বটেই ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ।

ঈদ মানে আনন্দ ও উৎসব। এ আনন্দোৎসবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ, বিশ্ব পরিমন্ডল সামিল। সকলেই আনন্দের অংশীজন। আব্বার কর্মমূখর সমৃদ্ধ জীবনের শিক্ষাই হোক আমার মানব কল্যাণের ব্রত। সার্থক হোক ঈদুল ফিতর। মানুষের সুখ ও আনন্দের উর্ধে আর কিছু নয়।

কড়চা/ আর ই টি

Facebook Comments
ভাগ